Advertisement

Monday, March 11, 2019


দুই বা তার বেশি বস্তুর মধ্যে দূরত্ব মাপতে আমরা সাধারণত যে রাশি ব্যবহার করি সেটা আসলে মাপে রৈখিক দূরত্ব। যেমন ধরা যাক ছবিতে A ও B এর দূরত্ব ২০ মিটার। এই ২০ মিটার কিন্তু এদের রৈখিক দূরত্ব। আবার ধরা যাক, A ও C এর দূরত্ব ৩০ মিটার। এটাও রৈখিক দূরত্ব।


তবে জ্যোতির্বিজ্ঞান বা ভূগোলে সমবসময় রৈখিক দূরত্ব (linear distance) দিয়ে কাজ চলে না। দরকার হয় কৌণিক (angular) দূরত্বের। রৈখিক দূরত্বের ব্যবহার একেবারেই নেই এমনটা ভাবলেও আবার বড্ড ভুল হয়ে যাবে।  আমরা জানি, আলো প্রতি সেকেন্ডে  ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে। এটা কিন্তু রৈখিক দূরত্বই। আবার পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব তিন লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। এটাও রৈখিক দূরত্ব। এভাবে রৈখিক দূরত্বও কিন্তু খুব কাজে লাগে। 


একইভাবে কাজে লাগে রৈখিক বেগ (linear velocity)। বেগ মানে হলো অবস্থান পরিবর্তনের হার। যেমন ধরুন, একটি বস্তু ১ সেকেন্ডে ১০ মিটার পথ গেল। তাহলে তার বেগ হলো সেকেন্ডে ১০ মিটার। বা কেতাবি ভাষায় $10 ms^{-1}$ । একইভাবে আরেকটি বস্তু যদি ৫ সেকেন্ডে ২০ মিটার যায়, তাহলে তার বেগ হবে $\frac {20}{5}$ বা $4 ms^{-1}$। সহজ কথায় বলা যায়, এক সেকেন্ডে (বা এক মিনিটে, যদি আপনি ভিন্ন মাপকাঠিতে মাপতে চান) নির্দিষ্ট দিকে অতিক্রান্ত দূরত্বই হলো বেগের মান।

কোনো বস্তু একটি নির্দিষ্ট বেগে যেতে থাকলে এই বেগকে বলা হয় সমবেগ (uniform velocity)। এক্ষেত্রে বেগ বের করার সূত্র খুব সোজা। বেগকে v, দুরত্বকে s এবং সময়কে t দিয়ে প্রকাশ করা হলে বেগ হবে,
$$v = \frac{s}{t}$$

এই সূত্রটিরই ব্যবহার একটু আগে আমরা করেছি। তবে বেগ যদি সুষম না হয়, তাহলে আর এই সূত্র কাজ করবে না। অবস্থান পরিবর্তনের হারকে যেমন বেগ বলে, তেমনি বেগ পরিবর্তনের হারকে বলে ত্বরণ (acceleration)। অসমবেগের ক্ষেত্রে ত্বরণের মান কাজে লাগে।

এতক্ষণ আমরা যা বললাম তার সবই কিন্তু রৈখিক কথাবার্তা। কৌণিক দূরত্ব কখন কাজে আসে তার একটি উদাহরণ চিন্তা করা যাক। আমরা জানি, রাতের আকাশে ধ্রুব তারা সবসময় উত্তর আকাশে থাকে। বরাবর উত্তর দিকের দিগন্তের উপরে। সময় গড়াবার সাথে সাথে অন্যান্য তারা পশ্চিম দিকে ঢলে পড়লেও ধ্রুব তারা থাকে প্রায় একই জায়গায়।

আরও পড়ুন
☛ দিক নির্ণয়ে ধ্রুব তারা

ধ্রুব তারা দিয়ে অক্ষাংশ বের করার দারুণ একটি উপায় আছে। কোনো জায়গা থেকে ধ্রুব তারা দিগন্ত থেকে যত ডিগ্রি উপরে থাকবে, ঐ জায়গার অক্ষাংশ হবে তত ডিগ্রি। যেমন বাংলাদেশের অক্ষাংশ প্রায় ২৩ ডিগ্রি। ফলে ধ্রুবতারাকেও উত্তর দিগন্ত থেকে ২৩ ডিগ্রি উপরে চোখে পড়ে। এই যে ভূমি থেকে ২৩ ডিগ্রি উপরের এই দূরত্ব, এটা কিন্তু রৈখিক দূরত্ব নয়। বরং কৌণিক দূরত্ব।

খালি হাতে রাতের আকাশের কৌণিক দূরত্ব মাপার বিস্তারিত উপায় লেখা আছে এখানে

এ তো গেল কৌণিক দূরত্বের কথা। অতএব, আগের মতোই, কৌণিক অবস্থান পরিবর্তনের হারই হলো কৌণিক বেগ। জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসংখ্য জায়গায় এর ব্যবহার আছে। যেমন ধরা যাক সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথের কথা। পৃথিবী মোটামুটি এক বছরে সূর্যকে পুরোটা ঘুরে আসে। একইভাবে চাঁদসহ কৃত্রিম উপগ্রহরা ঘোরে পৃথিবীর চারপাশে। এসব হিসাব-নিকাশে দরকার হয় কৌণিক বেগ।

কৌণিক বেগ মাপা হয় বস্তুর সাবেক ও বর্তমান অবস্থানের কৌণিক অবস্থান দিয়ে। অন্য কথায় দুই অবস্থানে উৎপন্ন কোণ দিয়ে।

উপরের চিত্র দেখুন। মনে করুন, একটু বস্তু ০ ডিগ্রি অবস্থানে আছে। এটি ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে যাত্রা শুরু করল। ধরুন ৩০ ডিগ্রি ঘুরল। আরও ধরুন এটা অতিক্রম করতে বস্তুটির ২ সেকেন্ড লাগল। তাহলে বস্তুটির কৌণিক বেগ হলো সেকেন্ডে ১৫ ডিগ্রি। আমরা ধরে নিচ্ছি, বেগ সুষম। মানে, বেগ বাড়ছে-কমছে না।

কোনো বস্তু ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরলে পুরো এক ঘূর্ণন সম্পন্ন হয়। যেমন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে পুরোটা একবার ঘুরে এলে ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরা হয়। ঘূর্ণন বৃত্তাকার না হলেও (যেমন কক্ষপথ কিন্তু উপবৃত্তাকার) পুরো ঘূর্ণনে ৩৬০ ডিগ্রি-ই হয়।

উপরে আমরা কৌণিক বেগকে ডিগ্রি আর সেকেন্ড দিয়ে প্রকাশ করেছি। তবে কোণের আন্তর্জাতিক একক হলো রেডিয়ান। সেই হিসেবে কৌণিক বেগের একক হলো প্রতি সেকেন্ডে অতিক্রান্ত রেডিয়ান। আমরা জানি, ১৮০ ডিগ্রিকে রেডিয়ান এককে বলা হয় π রেডিয়ান। তাহলে কোনো বস্তু অর্ধবৃত্ত ঘুরলে (উপরের ০ ডিগ্রি থেকে ১৮০ ডিগ্রি অবস্থানে এলে) π রেডিয়ান কৌণিক দূরত্ব অতিক্রম করা হবে। একইভাবে পুরো বৃত্ত ঘুরে অতিক্রম করা হবে 2π রেডিয়ান দূরত্ব। কৌণিক দূরত্বকে সাধারণত θ বা α দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

কৌণিক বেগ বের করার সূত্র হলো,

$$\omega = \frac{\theta}{t}$$

যেখানে $\omega$ (ওমেগা) হলো কৌণিক বেগ।

কৌণিক বেগের জন্যে যে অন্য কারও চারদিকে ঘুরে আসতে হবে এমন কোনো কথা নেই। যেমন পৃথিবী নিজ অক্ষের চারপাশেও ঘুরে। এ কারণেই দিন-রাত হয়। এখানে পুরো এক ঘূর্ণন, মানে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসতে সময় লাগে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। মানে এক দিন।

রাতের আকাশের তারা খুঁজে পেতে কৌণিক বেগের কারিশমা দেখতে পড়ুন:
☛ উজ্জ্বল তারাদের গল্প 

কৌণিক দূরত্ব থেকে আমরা সহজেই রৈখিক দূরত্ব বের করতে পারি।

উপরে চিত্রে বৃত্তটির ব্যসার্ধ r। তাহলে এর পরিধি হলো 2πr। মনে করুন, একটি সুতা দিয়ে একটি বৃত্ত বানানো হলো। বানানোর পরে এর ব্যাসার্ধ r হলে সুতার দৈর্ঘ্য ছিল 2πr। পরিধি মানে এটাই। আরেকভাবে চিন্তা করা যায়। বৃত্তটিকে একটি চাকা হিসেবে কল্পনা করুন। তাহলে এই চাকা পুরো একবার ঘুরলে 2πr দূরত্ব অতিক্রম করবে। পুরো একবার ঘূর্ণন! কথাটা চেনা চেনা লাগছে না? হ্যাঁ, পুরো একবার ঘূর্ণনের মানে হলো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসা। রেডিয়ান এককে 2π কোণ। তবে π এর ব্যবহার দুই জায়গায় আলাদা। 2πr এর π-এর মান হলো ৩.১৪১৫... যা একটি অমূলদ ধ্রুবক। বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের ভাগফল। আর 2π কোণ যখন বলা হবে, তখন π মানে হলো ১৮০ ডিগ্রি কোণ। এখানে π এর একক আছে (রেডিয়ান, বা ডিগ্রিতে বললে ১৮০ ডিগ্রি)। কিন্তু 2πr এর π-এর কোনো একক নেই। একটি বিশুদ্ধ সংখ্যা।

উপরের তথ্য কাজে লাগিয়ে আমরা সহজেই কৌণিক আর রৈখিক বেগের সম্পর্ক বুঝতে পারি।

মনে করি, একটি বস্তু ১ মিনিটে পুরো বৃত্ত ঘুরে এল। ধরি, বৃত্তের ব্যসার্ধ (r) ১০ মিটার। বিশাল এক বৃত্ত! তাহলে এর রৈখিক বেগ কত?

উত্তর হবে,
$$v = \frac{2 \pi r}{60} = \frac{2 \pi × 5}{60} = 1.05 ms^{-1}$$

একইভাবে ১ মিনিটে ১৮০ ডিগ্রি (π রেডিয়ান) বা অর্ধবৃত্ত ঘুরে এলে রৈখিক বেগ হবে $\frac{\pi r}{60} ms^{-1}$।

তার মানে, রৈখিক বেগের সাথে কৌণের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে।

বোঝাই যাচ্ছে, কোণের সাথে ব্যাসার্ধ গুণ করে সময় দিয়ে ভাগ দিলেই রৈখিক বেগ পাওয়া যাচ্ছে।
তার মানে, $v=\omega r$

উপরের সম্পর্ক থেকে বোঝা যাচ্ছে, কেন্দ্র থেকে যত দূরে যাওয়া হবে, রৈখিক দূরত্ব তত বেশি হতে হবে। মানে বৃত্তের কেন্দ্র থেকে বেশি দূরে থাকলে সমান কৌণিক দূরত্ব অতিক্রম করতে বেশি রৈখিক দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। বাস্তবে এর অনেক উদাহরণ আছে। যেমন দুটি গাড়ি মোড় ঘুরছে। দুটি গাড়িই কিন্তু সমান কোণ নিয়ে ঘুরবে। কিন্তু যেটি দূরে দিয়ে ঘুরবে সেটিকে বেশি রৈখিক পথ অতিক্রম করতে হবে।


একটু চিন্তা করুন। রাতের আকাশে ধ্রুবতারা একই জায়গায় থাকার সাথে এই ধারণার মিল আছে। 

আরও পড়ুন

আসলে কৌণিক বেগ নিয়ে লিখতে থাকলে কখনও কথা ফুরোবে না। তাই আপাতত ক্ষান্ত দিলাম। 
Category: articles

Tuesday, June 5, 2018

যে-কোনো গোলাকার জিনিসেই মেরু ও বিষুব অঞ্চল নামে দুটো অংশ থাকে। আরও সঠিক করে এ অঞ্চল দুটি থাকে ঘুর্ণনরত গোলাকার বস্তুতে। যেমন গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি। যেমন ধরুন, আমাদের পৃথিবী। এটি ঘুরছে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে। এ কারণেই আমরা সকালবেলা পূর্ব দিকে সূর্য উঠতে দেখি। ডুবে যেতে দেখি পশ্চিমে।

আরও পড়ুনঃ
☛ গ্রহের পরিচয়
নক্ষত্রের পরিচয়

পৃথিবী ঘুরছে পশ্চিম থেকে পূবে। 
এই ঘুর্ণন থেকেই বিষুব ও মেরু অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়। উপরের ছবির একেবারে মাঝখান দিয়ে উপরে-নীচে একটি রেখা কল্পনা করুন। এই রেখাটি পৃথিবীর পৃষ্ঠ বরাবর যাবে না। যাবে পৃথিবীর পেটের ভেতর দিয়ে। উপরের পৃথিবীটাকে ফুটবলের মতো চিন্তা করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এখন এই কল্পিত রেখাকে বলা হয় ঘুর্ণন অক্ষ। মানে যে রেখাকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘুরছে। এবার কল্পনা করুন এই রেখাটি উপরে ও নীচে কোন বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছেছে। এই দুটিই বিন্দুকেই বলা হয় মেরু (pole)। উপরের বিন্দুটি হলো উত্তর মেরু। অপর নাম সুমেরু। নীচের বিন্দুটির নাম কুমেরু বা দক্ষিণ মেরু। আর মেরু বিন্দু দুটির আশেপাশের অঞ্চলই মেরু অঞ্চল নামে পরিচিত।

এবার উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর মাঝখানে একটি রেখা কল্পনা করুন। অবশ্যই রেখাটি হবে পূর্ব-পশ্চিমে। এই রেখাটিরই নাম বিষুব রেখা (equator)। অপর নাম নিরক্ষ রেখা। এই রেখার উত্তরে পৃথিবীর যে অংশ পড়েছে তার নাম উত্তর গোলার্ধ (Northern hemisphere)। আর দক্ষিণের অংশের নাম দক্ষিণ গোলার্ধ।

পৃথিবীর মেরু ও বিষুব অঞ্চল। 

বিষুব অঞ্চলে পৃথিবীর পরিধি সবচেয়ে বেশি হয়। বিষয়টা খুব সহজ। উপরের ছবিতে দেখুন, বিষুব রেখা থেকে আমরা যতই উত্তরে বা দক্ষিণে যাব, ততই পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যাবধান কমে যাচ্ছে। তার মানে অক্ষ রেখা থেকে পৃষ্ঠের দূরত্ব কমে যাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হলে ফুটবলের কথা আবার মনে করুন। এভাবে যেতে যেতে মেরুতে গিয়ে দেখুন, পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে কোন ব্যবধানই নেই। দুটো একে অপরের সাথে মিশে গেছে।

এবার আরেকভাবে চিন্তা করি। আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, বিষুব অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ বেশি। মেরু অঞ্চলে কম। হ্যাঁ, এটা সত্যি। তবে একটু আগে আমরা যে ব্যাসার্ধের কথা বলেছি, সেটা ছিল অক্ষ রেখা থেকে পরিধির দূরত্ব। মানে উত্তরে-দক্ষিণে কল্পিত রেখার প্রতিটি বিন্দু থেকে পৃথিবীর পৃষ্ঠের দূরত্ব। তবে এবারে আমরা চিন্তা করছি পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্র থেকে দূরত্ব। এই ব্যসার্ধ আপাত দৃষ্টিতে মেরু ও বিষুব অঞ্চলে সমান হওয়ার কথা। কিন্তু আসলে তা নয়।

উপরের ছবি দুটোতে আমরা পৃথিবীকে একদম খাঁটি গোলকের মতো চিন্তা করেছি। পৃথিবী সেরকমই হতো যদি এটি স্থির থাকত। কিন্তু পৃথিবী ঘণ্টায় দেড় হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বেগে পশ্চিমে থেকে পূবে ঘুরছে। এই ঘূর্ণনের কারণেই বিষুব অঞ্চলটা একটি লম্বা হয়ে গেছে। অন্য দিকে মেরু অঞ্চলটা একটু চেপে গেছে। তার মানে পৃথিবীর সঠিক আকৃতি হবে এ রকম:
দেখুন মেরুর দিকে ব্যাসার্ধ b দিয়ে বোঝানো হয়েছে। আর বিষুব রেখায় ব্যাসার্ধ a। অবশ্যই a বড় b এর চেয়ে। ছবি থেকে বোঝাও যাচ্ছে কেন এমন হল। ছবির সূত্র

আরও পড়ুন: 
পৃথিবী কত জোরে ঘোরে?

এবারে আরও কিছু অঞ্চল চিনে নেওয়া যাক। উত্তর মেরু থেকে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি দক্ষিণ পর্যন্ত এলাকা নিয়ে একটি বৃত্ত আঁকলে যে এলাকা পাওয়া যায়, তাকে বলে সুমেরু বৃত্ত (arctic circle)। একইভাবে দক্ষিণ মেরুর উত্তর দিকে বৃত্ত আঁকলে তার নাম হয় কুমেরু বৃত্ত (antarctic circle)।

সুমেরু বৃত্ত ও আশেপাশের অঞ্চল। 
আবার বিষুব রেখা থেকে ২৩.৫ ডিগ্রি উত্তরে পূর্ব-পশ্চিমে কল্পিত রেখাকে বলে কর্কটক্রান্তি রেখা (tropic of cancer)। অন্য দিকে, একই কৌণিক দূরত্বে দক্ষিণের রেখাকে বলে মকরক্রান্তি রেখা (tropic of capricorn)। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের কর্কটক্রান্তি রেখা আমাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে চলে গেছে। আরও নিখুঁত করে বলা যায়, ঢাকার উপর দিয়ে চলে গেছে।

আরও পড়ুন: 
☛ পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ মেরু থাকলেও পূর্ব পশ্চিম মেরু নেই কেন?
Category: articles

Sunday, April 15, 2018

জ্যোতির্বিদ্যায় জ্যামতিক কোণের পরিমাপ বিভিন্ন কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধ্রুবতারা দেখে কোনো স্থানের অক্ষাংশ জানা যায়। ধ্রুবতারা সব সময় উত্তর আকাশে থাকে। এটি উত্তর দিগন্ত থেকে যত ডিগ্রি ওপরে থাকবে, ঐ জায়গার অক্ষাংশ হবে ঠিক তত। হ্যাঁ, বিষুব রেখার দক্ষিণের এলাকায় এই কৌশল কাজে আসবে না। কারণ ধ্রুবতারা থাকবে দিগন্তেরও নীচে!

উত্তর আকাশে ধ্রুবতারা থাকে অক্ষাংশের সমান কৌণিক উচ্চতায় 

এখন, ধ্রুবতারা দেখে অক্ষাংশ নির্ণয়ের জন্যে কোণ ও কোণের পরিমাপ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। আরও নানা কারণে কোণের পরিমাপ বুঝতে হয়। যেমন এক তারা দিয়ে আরেক তারা খুঁজে পেতে তারাদের কৌণিক দূরত্ব বুঝতে হয়।

আরও পড়ুন
☛ খালি হাতে আকাশ মাপুন
☛ দিক নির্ণয়ে ধ্রুবতারা

দুটো সরলরেখার মিলনেই তৈরি হয় কোণ। যেমন নীচের OA এবং OB রেখাদ্বয় ৫৫ ডিগ্রি কোণ তৈরি করেছে। আবার OA এবং OC রেখা তৈরি করেছে ৯০ ডিগ্রি কোণ। ৯০ ডিগ্রি কোণের অপর নাম সমকোণ। সমকোণের দেখা আমরা পাই হরদম। ভূমি থেকে একটি গাছ খাড়া ওপরে উঠলে গাছ ও ভূমি তৈরি করে সমকোণ। ঘরের পূর্ব ও উত্তর দিকের দেয়ালের মিলন তৈরি করে সমকোণ। আপনি যদি পূর্ব দিকে তাকিয়ে থাকেন, তবে ৯০ ডিগ্রি ডানে ঘুরলে পাবেন দক্ষিণ। পশ্চিম থেকে ৯০ ডিগ্রি ডানে ঘুরলে পাবেন উত্তর।
দুই রেখার মিলনে হয় কোণ 
আরও পড়ুন
সূর্য দেখে দিক নির্ণয়

একটিমাত্র রেখার যেকোনো এক বিন্দুতে কোণ মাপ পরিমাপ করলে হবে দুই সমকোণ বা ১৮০ ডিগ্রি। পূর্ব ও পশ্চিম দিক বরাবর একটি রেখা কল্পনা করলে পাওয়া যাবে ১৮০ ডিগ্রি। বৃত্তাকার পথে ১৮০ ডিগ্রি পথ ঘুরলে একটি অর্ধবৃত্ত তৈরি হবে। যেমনটা হয়েছে নীচের ছবিতে। দুইজন মানুষ উল্টো দিকে হাঁটতে থাকলে বলা যায়, তারা ১৮০ ডিগ্রি কোণে হাঁটছে। কেউ আগের কথা থেকে সরে এসে বিপরীত কথা বললে আমরা বলি, "১৮০ ডিগ্রি উল্টো বলছেন এখন?"  

১৮০ ডিগ্রি বা দুই সমকোণ 
তার মানে পুরো বৃত্ত ঘুরে এলে হবে ৩৬০ ডিগ্রি বা চার সমকোণ।
বিভিন্ন রকম কোণ।
ছবির সূত্রঃ ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারা  

কোণের পরিমাপ
কোণের আন্তার্জাতিক এককের নাম রেডিয়ান। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এই হিসাব জনপ্রিয় নয়। আমরা চিনি ডিগ্রি। এক রেডিয়ান হলো ৫৭ দশমিক ৩ ডিগ্রির সমান। জ্যোতির্বিদ্যায় নানা সময় ডিগ্রিকে আরও ছোট করে পরিমাপের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এটা দুইভাবে করা যায়। একটি হলো দশমিক পদ্ধতি। যেমন ৩০.৫ ডিগ্রি মানে ৩০ ডিগ্রি ও আরও এক কোণের অর্ধেক। তবে আরেকটি সুবিধাজনক উপায়ও আছে।

ডিগ্রির অপেক্ষাকৃত ছোট এককগুলোর নাম হলো মিনিট ও সেকেন্ড। না, এখানে সময়ের কথা বলছি না। এক ডিগ্রিকে ৬০ ভাগ করলে তার প্রতি অংশের নাম এক মিনিট। আবার এক মিনিটকে ৬০ ভাগ করলে প্রতি ভাগের নাম হয় এক সেকেন্ড। হ্যাঁ, সময়ের সাথে এখানটা মিলে গেছে! ভাগগুলোকে যথাক্রমে আর্কমিনিট (ডিগ্রির ৬০ ভাগের এক ভাগ) ও আর্কসেকেন্ডও (মিনিটের ৬০ ভাগের এক ভাগ) বলে।

যেমন ৪০.১৮৭৫ ডিগ্রি কোণকে এভাবেও লেখা যায়: ৪০ ডিগ্রি ১১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। একে এভাবেও লেখা হয়: ৪০° ১১′ ১৫″।
Category: articles

Tuesday, December 6, 2016

[লেখাটি ইতোপূর্বে ব্যাপন ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল।]

অ্যানড্রোমিডার বিস্ময়কর কিছু কথা জানব। তবে, আগে সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

আপনারা কি আকাশে কখনো  ছায়াপথ (Galaxy) দেখেছেন? হয়ত বা দেখে থাকলেও থাকতে পারেন! রাতের আকাশে যে শুধু তারকাই দেখা যায় না, তার আরেক উদাহরণ হল অ্যানড্রোমিডা গ্যালাক্সি। আমাদের মিলিওয়েতে গ্যালাক্সি যেমন সূর্যসহ অসংখ্য নক্ষত্রের বাস, তেমনি বহু নক্ষত্রে গড়া (নেবুলাসহ আরো বিভিন্ন পদার্থের পাশাপাশি) আরেকটি গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ হল অ্যানড্রোমিডা। 

অ্যানড্রোমিডা গ্যালাক্সি

অ্যানড্রোমিডা একটি সর্পিলাকার ছায়াপথ (spiral galaxy)। অবস্থান অ্যানড্রোমিডা তারামণ্ডলে। অপর নাম মেসিয়ার ৩১ বা এম৩১ (M31), জ্যোতির্বিদ চার্লে মেসিয়ে এর নাম অনুসারে। একে আবার অনেক সময় গ্রেট নেবুলাও বলা হত। বড় ছায়াপথদের মধ্যে অ্যানড্রোমিডা হল আমাদের ছায়াপথের সবচেয়ে নিকটবর্তী ছায়াপথ। নাম রাখা হয়েছিল পৌরাণিক রাজকুমারী অ্যানড্রোমিডার নাম অনুসারে। লোকাল গ্রুপ নামের প্রায় ৫৪টি গ্যালাক্সির একটি গুচ্ছের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়। আমাদের মিল্কিওয়ে হল লোকাল গ্রুপের দ্বিতীয় বৃহত্তম সদস্য। 

প্রায় ১ ট্রিলিয়ন (১ লক্ষ কোটি) নক্ষত্রের সমন্বয়ে গঠিত অ্যানড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এই ছায়াপথটি আমাদের থেকে ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। ব্যাস প্রায় ২২০,০০০আলোকবর্ষ, যেখানে আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের ব্যাস ১০০,০০০ আলোকবর্ষ। অর্থাৎ এর সাইজ আমাদের মিল্কিওয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। সেদিক থেকে বিচার করলে আমাদের মিল্কিওয়ের ভর অনেক বেশি।

আরও পড়ুনঃ

সাতটি সর্পিল বাহু বিশিষ্ট এই ছায়াপথটির নিউক্লিয়াসের সাথে সংযুক্ত আছে দুটি বাহু । বাকী পাঁচটি সর্পিল বাহু অধিকার করে আছে অসংখ্য সৌরমন্ডলকে। এর নিউক্লিয়াস তৈরী হয়েছে এক কোটি গোল নক্ষত্রগুচ্ছের (Globular Cluster) সমন্বয়ে। ছায়াপথটির ভেতরের অংশের পূর্ণ ঘূর্ণন সমাপ্ত হতে সময় লাগে ১১ মিলিয়ন বছর আর বাইরের অংশটুকু সমাপ্ত করে ৯০ থেকে ২০০ মিলিয়ন বছরে (১ মিলিয়ন সমান ১০ লাখ)।

কিন্তু মজার ব্যাপার হল, আমাদের মহাবিশ্বে ছায়াপথের আসল সংখ্যা কত সেটা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারবে না। কারণ, জ্যোতির্বিদরা যতই মহাবিশ্বের দিকে তাকাচ্ছেন, ততই বেরিয়ে আসছে নতুন নতুন ছায়াপথ। মহাবিশ্বের এখনও অনেক জায়গা আছে, যেটা বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেননি। কিছু কিছু জায়গা আছে, যা টেলিস্কোপ দিয়েও দেখা যায় না। তবু জ্যোতির্বিদদের হিসাব অনুসারে মহাবিশ্বে ছায়াপথের সংখ্যা আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০ বিলিয়ন (১ বিলিয়নে ১০০ কোটি)। 


অ্যানড্রোমিডা সম্পর্কে কিছু বিস্ময়কথা জেনে নেওয়া যাকঃ 

১। মিল্কিওয়ে বনাম অ্যানড্রোমিডাঃ

লোকাল গ্রুপের গ্যালাক্সিদের মধ্যে সম্ভবত মিল্কিওয়ের ভর-ই সবচেয়ে বেশি। তবুও আনড্রোমিডা ছায়াপথেই নক্ষত্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। স্পিটজার স্পেস টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে, এতে নক্ষত্রের সংখ্যা মিল্কিওয়ের প্রায় দ্বিগুণ। সাইজেও এটিই বড়।


২। এক সময় আনড্রোমিডাকে নীহারিকা ভাবা হতঃ

যখন মহাবিশ্বের প্রকৃত পরিধি কেউ জানত না, তখন ধারণা করা হত, আমাদের মিল্কিওয়ে গালাক্সি-ই মহাবিশ্বের সব কিছু। অ্যানড্রোমিডা গালাক্সিকে এর ভেতরেই অবস্থিত বলে মনে করা হত, যাকে শুধুমাত্র একটা অস্পষ্ট দাগের মতো দেখা যেত। কিন্তু বিংশ শতকে অত্যন্ত শক্তিশালী টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পর দ্বারা পর্যবেক্ষণ করে জানা গেল, এটি নিজেই আরেকটি গ্যালাক্সি। তার আগের টেলিস্কোপগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুসারে এটি ছিল মহাজগতিক ধূলোর মেঘ এবং শুধুমাত্র নক্ষত্র গঠনের উপাদানসমূহ এতে বিদ্যামান। এর মাধ্যমে তখন ধরে নেওয়া হয়েছিল, বিশাল অ্যানড্রোমিডা একটা নীহারিকা মাত্র। নতুন তারকা তৈরির অঞ্চলকে বলা হয় নীহারিকা। 

৩। অ্যানড্রোমিডায় ব্ল্যাক হোল!

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হল, অ্যানড্রোমিডার শুধু কেন্দ্রেই ২৬ টির মতো ব্ল্যাক হোল আছে। এছাড়াও চন্দ্র এ-ক্সরে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সাহায্যে আরো অনেকগুলো ব্ল্যাক হোল খুঁজে পাওয়া গেছে। আমাদের ছায়াপথের মতোই অ্যানড্রোমিডার কেন্দ্রে একটি বিশাল ব্লাকহোল আছে। আরও দুটি যুগল ব্ল্যাক হোল একে অপরকে ঘিরে পাক খাচ্ছে। এদের ভর সূর্যের প্রায় ১৪ কোটি গুণ।

আরো পড়ুনঃ
ব্ল্যাক হোলের পরিচয়

৪। ইতিহাসঃ

এই গ্যালাক্সিটি আবিস্কার করেছিলেন পারস্যের এক মুসলমান জ্যোতির্বিদ আব্দুর রহমান আস-সুফি। ৯৬৪ সালে তিনি গ্যালাক্সিটি পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু সেই সময়ে গ্যালাক্সি সম্পর্কে মানুষের ধারণা না থাকায় তিনি `তার "Book of Fixed Stars" গ্রন্থে এর নাম দেন 'Small Cloud' বা 'ক্ষুদ্র মেঘ'। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকেও বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে, মিল্কিওয়ে-ই হল মহাবিশ্বের একমাত্র ছায়াপথ। অ্যানড্রোমিডাকে গ্যালাক্সিকে তখন মনে করা হত নীহারিকা। কিন্তু এডউইন হাবলের সম্প্রসারণ তত্ত্ব
পাওয়ার পর জানা গেল, মিল্কিওয়ে আসলে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র একটা অংশ মাত্র। অ্যানড্রোমিডাকে মেসিয়ার -৩১ নামকরণ করেন বিজ্ঞানী চার্লস মেসিয়ে, ১৭৬৪ সালে। তবে তিনি এর আবিস্কারের কৃতিত্ব দিতে চেয়েছিল জার্মান জ্যোতির্বিদ সাইমন মারিয়াসকে। বর্তমানে অবশ্য আব্দুর রহমান আস-সুফিকে এর আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেওয়া হয়। 

৫। মিল্কিওয়ের সাথে সংঘর্ষঃ

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন, কয়েকশ কোটি বছরের মধ্যেই এটি আমাদের গ্যালাক্সির উপর এসে পড়বে। দুটো মিলে বড় একটি উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সিতে পরিণত হবে। যদিও মহাবিশ্ব সামগ্রিকভাবে প্রসারিত হচ্ছে, তবুও কাছাকাছি অবস্থিত এই দুটি গ্যালাক্সি মহাকর্ষের আকর্ষণ এড়াতে পারছে না। এরা প্রতি সেকেন্ডে ৭৫ মাইল বেগে একে অপরের দিকে ধেয়ে আসছে।
ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।  তত দিন আমরা থাকব না। আর আসলে ঐ সংঘর্ষে নক্ষত্রদের মতো ছোট জায়গায়ও বড় কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।

আনড্রোমিডা সম্পর্কে  একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হল, এটি আমাদের সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি। এটি হল, বামন ক্যানিস ম্যাজর
আরো পড়ুনঃ
☛ আমাদের নিকটতম গ্যালাক্সি কোনটি? 


সূত্রঃ
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Andromeda_Galaxy
৩। https://en.wikipedia.org/wiki/Milky_Way
Category: articles

Friday, November 25, 2016

পালসার হল এক ধরনের নিউট্রন নক্ষত্র। পালসার শব্দটি আসলে পালসেটিং স্টার (pulsating star) কথার সংক্ষেপ। Pulsate শব্দের অর্থ হল স্পন্দিত হওয়া। এরা নিয়মিত বিরতিতে স্পন্দিত হয় বলেই এই নাম। এরা আবার খুব দ্রুত আবর্তিত হয়। নির্গত করে তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ। নির্গত বেতার সঙ্কেত কাজে লাগিয়েই খুঁজে বের করা হয় এদেরকে।পালসারকে মহাবিশ্বের লাইটহাউজ বা আলোকবর্তিকাও বলা হয়।

আরো পড়ুনঃ
নিউট্রন নক্ষত্র কাকে বলে?

সৃষ্টিঃ
এরা যেহেতু এক ধরনের নিউট্রন স্টার, তাই সৃষ্টিও ওদের মতোই। ধরুন, একটি নক্ষত্রের ভর সূর্যের ৪ থেকে ৮ গুণ। জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে এটি মৃত্যুমুখে পতিত হবার সময় পরিণত হয় নিউট্রন নক্ষত্রে। ঘটে একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণ। নক্ষত্রের বাইরের অংশ ছিটকে যায় মহাশূন্যে। ভেতরের অংশ গুটিয়ে ছোট্ট হয়ে যায়। এ সময় এর মহাকর্ষ এত শক্তিশালী হয় যে এর মধ্যে থাকা প্রোটন ও ইলেকট্রন মিলিত হয়ে নিউট্রন হয়ে যায়। এদের ভর আরো বেশি হলে হয় ব্ল্যাক হোল। আর কম হলে শ্বেত বামন (white dwarf)।

পালসার ও একটি সঙ্গী তারা 

নক্ষত্রের ভর ১ দশমিক ৪ থেকে ৩ দশমিক ২ এর মধ্যে থাকলেও এরা সুপারনোভার মতো বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। তবে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হবার জন্যে এ পরিমাণ ভর যথেষ্ট নয়। এরা বরং নিউট্রন নক্ষত্রে পরিণত হয়। এদেরই কেউ কেউ পরিণত হয় পালসারে। কেউ বা আবার হয় ম্যাগনেটার

সাইজে ছোট্ট হয়ে গেলেও এরা  কৌণিক ভরবেগ অক্ষুণ্ণ রাখে। কিন্তু সাইজ ছোট্ট হয়ে যাবার কারণে এ সময় আবর্তন বেগ প্রচণ্ড বেড়ে যায়। এ অবস্থায় এরা প্রতি সেকেন্ডে বহুবার ঘুরে। এই ক্ষুদ্র ও খুব ঘন এই বস্তুরা এদের চৌম্বক ক্ষেত্র রেখা বরাবর নির্গত করে খুব শক্তিশালী বিকিরণ। বিকিরণ যে সব সময় ঘূর্ণন অক্ষের বরাবরেই থাকবে, এমন কোনো কথা নেই।


ইতিহাসঃ
১৯৬৭ সালে জোকেলিন বেল বার্নেল ও অ্যান্টনি হিউইশ প্রথম পালসার আবিষ্কার করেন। বিজ্ঞানী মহল বিস্ময়ে হতবাক। কারণ, একেবারে নিয়মিত বিরতিতে পাওয়া যাচ্ছে বেতার সঙ্কেত। আকাশের একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে পাওয়া যাচ্ছিল সঙ্কেত। ঠিক ১ দশমিক ৩৩ সেকেন্ড পর পর সঙ্কেত খুব তীব্র হচ্ছিল। এত নিয়মিত বিরতিতে সঙ্কেত আসছে দেখে কোনো কোনো জ্যোতির্বিদ তো ভেবেই বসেন, এটা হয়ত অন্য কোনো মহাজাগতিক সভ্যতার কাজ!

বার্নেল ও হিউইশ নিশ্চিত ছিলেন, এটা নিতান্তই প্রাকৃতিক ঘটনা। কোনো সভ্যতার কাজ নয়। তবু তাঁরা এর নাম দিলেন এলজিএম-১ (LGM-1)। এলজিএম মানে হল লিটল গ্রিন ম্যান বা ক্ষুদ্র সবুজ মানব। প্রথম আবিষ্কৃত পালসারটির নাম ছিল পিএসআর বি১৯১৯+২১ ( PSR B1919+21)। এর পরে আরও পালসার আবিষ্কৃত হতে থাকলে এদের প্রকৃত রহস্য আস্তে আস্তে উন্মোচিত হতে থাকে।

কিছু দিন পর কাঁকড়া নেবুলায় আরেকটি পালসার পাওয়া যায়। এর পর্যায়কাল মাত্র ৩৩ মিলিসেকেন্ড। এ পর্যন্ত প্রায় ১৬০০ পালসার পাওয়া গেছে। এদের একটি তো মাত্র এক সেকেন্ডে ৭১৬ টি সঙ্কেত প্রেরণ করে। পরে পালসারদেরকে পাওয়া গেল বাইনারি জগতেও। এর ফলে আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের আরেকটি স্বীকৃতি অর্জন হয়েছিল। ১৯৮২ সালে পাওয়া গেল আরেকটি বিস্ময়কর পালসার। এর আবর্তনকাল মাত্র ১ দশমিক ৬ মাইক্রো সেকেন্ড।
সৌরজগতের বাইরে প্রথম কোনো গ্রহের সন্ধানও পাওয়া গিয়েছিল একটি পালসারের পাশে।

মজার তথ্যঃ
প্রথমে যখন  একটি পালসারের জন্ম হয়, তখন এর শক্তি ও আবর্তনের গতি থাকে খুব উচ্চ। তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ নির্গত করতে করতে এটি শক্তি হারিয়ে ফেলে। কমে যায় ঘুর্ণনের গতিও। ১ থেকে ১০ কোটি বছরের মধ্যে এটি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সক্রিয় থাকার সময় এরা দারুণভাবে সময় মেনে চলে। এমনকি সময়ের হিসাব রাখতে জ্যোতির্বিদরাও এদের ওপর ভরসা রাখেন। কিছু কিছু পালসারের সূক্ষ্মতা  হার মানায় আণবিক ঘড়িকেও

সূত্রঃ
১। http://www.universetoday.com/25376/pulsars/
২। https://en.wikipedia.org/wiki/Pulsar
Category: articles

Tuesday, November 22, 2016

নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এটা এক ধরনের নক্ষত্র। তবে সাধারণ নক্ষত্রদের চেয়ে আলাদা। এদের ব্যাস মাত্র ২০ কিলোমিটারের মতো। আর ভর সূর্যের প্রায় ১ দশমিক ৪ গুণ। তার মানে অতি সামান্য জায়গায় অনেক বেশি ভর। আপনি যদি নিউট্রন নক্ষত্রের মাত্র এক চা-চামচ পরিমাণ নিয়ে পৃথিবীতে ওজোন করেন, দেখা যাবে ওটাই হয়ে যাচ্ছে একশ কোটি টন!

নিউট্রন স্টার 

বেশি ঘনত্ব ও ছোট্ট সাইজের কারণে এদের মহাকর্ষ হয় অত্যন্ত শক্তিশালী। পৃষ্ঠে মহাকর্ষের তীব্রতা থাকে পৃথিবীর 2 x 1011  গুণ (২ এর পরে ১১টি শূন্য দিলে যে সংখ্যা হবে)। এদের থাকে অতি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রও। তাও পৃথিবীর চেয়েও ১০ লক্ষ গুণ!

নক্ষত্রদের জীবনের একটি অন্তিম পরিণতি হল এই নিউট্রন স্টার। যেসব ভারী নক্ষত্রের ভর শুরুতে সূর্যের ৪ থেকে ৮ গুণ থাকে, তারাই পরবর্তীতে পরিণত হয় নিউট্রন স্টার-এ। নিউক্লিয়ার জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে এদের মধ্যে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে। এই বিস্ফোরণের সময় এদের বাইরের স্তর আলাদা হয়ে যায়। নক্ষত্রের কেন্দ্রীয় অঞ্চল মহাকর্ষের প্রভাবে গুটিয়ে যায়। এটা এত বেশি সঙ্কুচিত হয় যে, প্রোটন ও ইলেকট্রন মিলিত হয়ে নিউট্রনে পরিণত হয়। ফলে এরা গঠিত হয় শুধুই নিউট্রন দিয়ে! আর নামটি নিউট্রন স্টার হয়েছে সে জন্যেই।

আরো পড়ুনঃ 
 নক্ষত্রের জীবন চক্র 

সুপারনোভা বিস্ফোরণের পরে এরা একাকীও থাকতে পারে, আবার অন্য কোনো তারকার সাথে মিলে বাইনারি স্টার হিসেবে আচরণ করতে পারে (বাইনারি স্টাররা (দুটি নক্ষত্র) একটি নির্দিষ্ট যৌথ ভরকেন্দ্রকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে)। এখন পর্যন্ত জানা গেছে, এমন চারটি নিউট্রন নক্ষত্র পাওয়া গেছে যাদের চারপাশে গ্রহ আছে।


পৃথিবীর তুলনায় নিউট্রন নক্ষত্রের সাইজ

নিউট্রন নক্ষত্ররা বাইনারি জগতের সদস্য হলে ভর মাপা সহজ হয়ে যায়। রেডিও ও এক্স-রে  টেলিস্কোপের সাহায্যে অনেকগুলো নিউট্রন স্টারকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এ পর্যবেক্ষণ  থেকেই জানা গেছে, এদের ভর সূর্যের প্রায় ১ দশমিক ৪ গুণ হয়। বাইনারি জগতের দুটো সদ্যসের একটি সম্পর্কে কিছু জানা না থাকলেও অপরটির তথ্য কাজে লাগিয়ে বের করে ফেলা যায়, সেটি আসলে আরেকটি নিউট্রন নক্ষত্র, নাকি ব্ল্যাক হোল

আবর্তনশীল নিউট্রন স্টারদেরকে বলা হয় পালসার

আরো পড়ুন নিয়মিত ধারাবাহিকঃ
 ব্ল্যাক হোলের গভীরে
↠ পালসার কাকে বলে?

সূত্রঃ
১। http://imagine.gsfc.nasa.gov/science/objects/pulsars1.html
Category: articles

Wednesday, June 29, 2016

নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে নিশ্চয় দুটি তারা জড়িত আছে ব্যাপারটায়। আসলেই তাই। তবে একটু সতর্ক হতে হবে। দুটি তারকা নিয়ে আরেক ধরনের সিস্টেম গঠিত হতে পারে, যার নাম বাইনারি স্টার।
সাধারণত পৃথিবী থেকে টেলিস্কোপ দিয়ে দেখতে কাছাকাছি অবস্থানে থাকা দুটি তারকাকে ডাবল স্টার বলে। বাংলায় একে অনেক সময় যুগলতারা বলা হয়।
অন্তত দুটি কারণে একাধিক তারকা ডাবল স্টার নাম পেতে পারে। এক, হতে পারে এরা বাইনারি স্টার। বাইনারি স্টার হচ্ছে দুটি তারকার এমন একটি ব্যবস্থা যাতে এরা একে অপরকে উভয়ের যৌথ মহাকর্ষ কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে ঘোরে। এদেরকে বাংলায় সাধারণত জোড়াতারা নামে ডাকা হয়।
বাস্তবে অনেক দূরে অবস্থিত দুটি তারা আকাশের একই দিকে অবস্থিত হলেও ডাবল স্টার দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে এদের মধ্যে কোনো মহাকর্ষীয় আকর্ষণ থাকে না। নিছক ঘটনাক্রমে এদেরকে কাছাকাছি দেখা যায়।
বকমণ্ডলীর ডাবল স্টার আলবিয়েরো
১৭৮০ সালের দিক থেকে জ্যোতির্বিদরা ডাবল স্টারদের দূরত্ব ও এদের নিজেদের কৌণিক দূরত্ব বের করা শুরু করেন। যদি এদের আপেক্ষিক গতি কক্ষপথের চাপের মতো দেখা যায়, অথবা এদের প্রকৃত গতির তুলনায় আপেক্ষিক গতি যদি ক্ষুদ্র হয়, তাহলে ধরে নেওয়া হয় এরা বাইনারি স্টার। অন্য ক্ষেত্রে এরা দেখতেই ডাবল, বাস্তবে একে অপরের সাথে সম্পর্কহীন।
সপ্তর্ষীমণ্ডলীর নক্ষত্র মিজার একটি যুগলতারা। ১৬৮৫ সালে দেখা যায় রাতের আকাশের ১৩তম উজ্জ্বল নক্ষত্র অ্যাক্রাক্সও একটি যুগলতারা। এরপর থেকেই ডাবল স্টারের খোঁজার হিড়িক পড়ে যায়।
দেখা যায় যে উত্তর গোলার্ধের আকাশে আপাত উজ্জ্বলতা +৯ এর বেশি এমন প্রায় ১৮টি তারকার মধ্যে ১ টি করে তারকা যুগলতারা গঠন করে, যদি ৩৬ ইঞ্চি টেলিস্কোপ দিয়ে দেখলে।
বকমণ্ডলীর নক্ষত্র আলবিয়েরো একটি ডাবল স্টার।
আরো পড়ুনঃ 
এ সপ্তাহের তারাঃ মিজার ও অ্যালকর 
সপ্তর্ষীমণ্ডলীর ডাবল স্টার মিজার ও অ্যালকর 
সূত্রঃ
১। https://en.wikipedia.org/wiki/Mizar_and_Alcor
২। http://astrobob.areavoices.com/2013/07/26/check-out-albireo-summers-most-spectacular-double-star/
Category: articles

Sunday, May 15, 2016

রাতের আকাশের তারাসহ বিভিন্ন বস্তুর অবস্থান নির্ণয়ের জন্যে বিষুব লম্বের সাথে পরিচয় থাকা দরকার। আপনারা নিশ্চয়ই পৃথিবীর অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা সম্পর্কে জানেন। পৃথিবীর দুই মেরুর ঠিক মাঝ বরাবর পূর্ব পশ্চিমে কল্পিত রেখার নাম নিরক্ষ রেখা বা বিষুব রেখা (Equator)। বিষুব রেখার সমান্তরালে উত্তরে বা দক্ষিণে যে রেখাগুলো কল্পনা করা হয় সেগুলোই হল অক্ষাংশ রেখা। এই রেখার উপরের কোনো বিন্দুর নাম অক্ষাংশ (Latitude)। দ্রাঘিমা বলা হয় উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে যাওয়া রেখাগুলোর উপরের অবস্থানকে। বিষুব লম্ব বুঝতে হলে অন্তত অক্ষাংশ বোঝা প্রয়োজন।
পৃথিবীর অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমা

বাংলাদেশের অক্ষাংশঃ
বাংলাদেশ বা এর পাশ্ববর্তী অঞ্চল থেকে তারা চিনতে বিষুব লম্ব সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান জানা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিষুব রেখা থেকে ২৩ ডিগ্রি উত্তরে অবস্থিত। ফলে এর অক্ষাংশ হল ২৩ ডিগ্রি উত্তর। ঠিক এই জায়গা দিয়েই দুটি ক্রান্তীয় রেখার একটি কর্কটক্রান্তি (Tropic of cancer) রেখা চলে গেছে পূর্ব- পশ্চিমে।
পৃথিবীতে বাংলাদেশের অবস্থান ২৩ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে

এবার মূল আলোচনায় আসি।
আমাদের আকাশকে মাথার উপরে একটি গম্বুজের মত কল্পনা করুন। যদিও আসলে তারাগুলো পৃথিবী থেকে ভিন্ন ভিন্ন দূরত্বে অবস্থিত তবু রাতের আকাশে এদেরকে এরকম কোন কল্পিত গম্বুজে ছাঁটানো লাইটের মতই মনে হয়। এটা ধরে নিলে তারাদেরকে অবস্থান নির্ধারণ করাও সহজ হয়ে যায়। তাহলে আকাশকে গম্বুজ কল্পনা করলেন। আমরা বোঝার জন্যে যাকে গম্বুজ কল্পনা করলাম তার সঠিক নাম খ-গোলক (Celestial Spehere)। এবার বিষুব রেখার ঠিক বরাবর উপরে খ-গোলকের মধ্যে একটি রেখা কল্পনা করুন। একে বলা হয় খ-বিষুব।
আকাশের নামকরণ 

খ-বিষুব থেকে উত্তরে বা দক্ষিণে অবস্থিত তারাদের অবস্থান পৃথিবীর অক্ষাংশের মতোই বের করা হয়। তবে পৃথিবীর ক্ষেত্রে আমরা উত্তর ও দক্ষিণের জন্যে মানের আগে যথাক্রমে উত্তর ও দক্ষিণ কথাটা যোগ করি। যেমন বাংলাদেশে অবস্থান ২৩ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে। কিন্তু খ-গোলকের ক্ষেত্রে উত্তরে হলে এর আগে + চিহ্ন এবং দক্ষিণে মাইনাস চিহ্ন (-) বসানো হয়। এই অবস্থানগুলোর নামই হল বিষুব লম্ব (Declination)।
কোনো তারার বিষুব লম্ব (+২৩) ডিগ্রি হলে এটি বাংলাদেশে আমাদের ঠিক মাথার উপর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যাবে। যেমন, রাতের আকাশের চতুর্থ উজ্জ্বল নক্ষত্র স্বাতীর বিষুব লম্ব (+১৯) ডিগ্রি। তাই এটি পূর্ব দিকে উঠার পরে এক সময় আমাদের মাথার উপরে চলে আসে। পরে আবার চলে যায় পশ্চিম দিকে।
আবার রাতের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র লুব্ধকের বিষুব লম্ব হল (-১৬) ডিগ্রি। ফলে কখনো আমাদের মাথার উপর আসে না, দক্ষিণ দিক দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে চলে যায়। আবার ধ্রুবতারা বিষুব লম্ব প্রায় (+৯০) ডিগ্রি। তাই উত্তর মেরুতে গেলে এটি ঠিক মাথার উপর থাকবে।

আরো পড়ুনঃ
উজ্জ্বল তারাদের গল্প
তারামণ্ডলীর পরিচয়
☛ তারা পরিচিতিঃ এ সপ্তাহের তারা 
Category: articles

Tuesday, April 26, 2016

সহজ কথায় বললে, সূর্যের চারদিকে কোন গ্রহের কক্ষপথের নিকটতম বিন্দুকে অনুসূর (Perihelion) এবং দূরতম বিন্দুকে অপসূর (Aphelion) বলে। অনুসূর অবস্থান পাড়ি দেবার সময় গ্রহরা জোরে এবং উল্টোভাবে অপসূর দিয়ে যাবার সময় ধীরে চলে।
আমাদের সৌরজগতের গ্রহরা সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। কিছু গ্রহের কক্ষপথ প্রায় বৃত্তাকার। অধিকাংশেরই কক্ষপথ ছড়ানো, অনেকটা ডিম্বাকৃতির। আরো সঠিক করে বললে উপবৃত্তাকার। আর এই উপবৃত্তাকার হবার কারণেই সূর্য থেকে গ্রহদের দূরত্ব নির্দিষ্ট থাকে না।
উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্য থেকে বুধ গ্রহের দূরত্বের পরিবর্তন
সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে আসার সময় পৃথিবী প্রতি বছর এক বার করে অপসূর ও অনুসূর অবস্থান পাড়ি দেয়। অন্য গ্রহরাও সূর্যকে একবার ঘুরে আসতে একবার করে বিন্দু দুটিকে অতিক্রম করে। সাধারণত জানুয়ারি মাসে পৃথিবী সূর্যের সবচেয়ে নিকটে ও জুলাই মাসে সবচেয়ে দূরে থাকে। একে সহজাত বুদ্ধির বিপরীত মনে হয়। কারণ আমরা জানি, জানুয়ারি মাসে শীতকাল থাকে (বাংলাদেশসহ অনেকগুলো দেশে)।তাহলে শীতকালে সূর্য আমাদের সবচেয়ে কাছে থাকে- এটাকি বিশ্বাসযোগ্য? বিশ্বাসযোগ্য না হলেও এটাই বাস্তবতা।
আসলে শীত বা গরম পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বের উপর নির্ভর করে না বললেই চলে। এটা নির্ভর করে পৃথিবীর কক্ষীয় নতীর উপর। পৃথিবী এর কক্ষীয় তলের সাথে সাড়ে তেইশ ডিগ্রি পরিমাণ হেলে আছে। ফলে, যে অঞ্চল যখন সূর্যের দিকে হেলে থাকে তখন তাতে গরম অনুভূত হয় এবং উল্টো পাশে বজায় থাকে শীত। এ জন্যেই জানুয়ারি মাসে উত্তর গোলার্ধে শীত থাকলেও দক্ষিণ গোলার্ধে কিন্তু ঠিকই গরম থাকে।
২০১০ সালে পৃথিবীর অপসূর ও অনুসূর 

সূর্যের নিকটতম অবস্থানে থাকার সময় পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব থাকে ৯ কোটি ১০ লক্ষ মাইল বা ১৪ কোটি ৭০ লক্ষ কিমি.। অন্য দিকে অপসূর অবস্থানে এই দূরত্ব হচ্ছে ৯ কোটি ৫০ লক্ষ মাইল বা ১৫ কোটি ২০ লক্ষ কিমি.। একেই আমরা গড় করে সাধারণত বলি ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল বা ১৫ কোটি কিমি.। পৃথিবী থেকে সূর্যের এই গড় দূরত্বকে বলা হয় অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট।
আরো পড়ুনঃ জ্যোতির্বিদ্যায় দূরত্বের এককেরা

অনুসূর ও অপসূর কথাগুলো গ্রহদের পাশাপাশি ধূমকেতু ও গ্রহাণুদের জন্যেও প্রযোজ্য। ইংরেজি perihelion শব্দটি peri এবং helios গ্রিক শব্দদ্বয় থেকে আগত। peri শব্দের অর্থ নিকটে এবং helios অর্থ সূর্য। ফলে perihelion এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে সূর্যের নিকট বিন্দু। একইভাবে গ্রিক apo শব্দের অর্থ দূরে। ফলে aphelion এর দাঁড়াচ্ছে সূর্যের দূরতম বিন্দু। বাংলায় ভেঙ্গে অর্থ করলেও প্রায় একই রকম ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। কারণ সূর কথাটা এসেছে সূর্য থেকেই।
অন্য দিকে, চাঁদও পৃথিবীর চারদিকে উপবৃত্তাকার পথে চলে। ফলে চাঁদের ক্ষেত্রেও পৃথিবীর নিকটতম ও দুরতম দুটি বিন্দু আছে। এদের  জন্যে আছে আলাদা নাম। নিকটতম বিন্দুর নাম অনুভূ এবং দূরতম বিন্দুর নাম অপভূ। বুঝতেই পারছেন, ভূ মানে পৃথিবী। আর অনুভূ মানে পৃথিবীর নিকটে।

সূত্রঃ
[১] http://www.windows2universe.org/physical_science/physics/mechanics/orbit/perihelion_aphelion.html
Category: articles