Advertisement

রবিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৩

মহাকাশের বস্তুদের দূরত্ব নির্ণয় জ্যোতির্বিদ্যার অন্যতম বড় একটি সমস্যা। আকাশের দিকে খালি চোখে তাকিয়েই তো আর তারাদের দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। এ কারণেই প্রাচীন জ্যোতির্বিদরা ভাবতেন, আকাশের সবগুলো তারা পৃথিবী থেকে একই পরিমাণ দূরত্বে একটি গোলকীয় পৃষ্ঠে বসানো আছে। 

নক্ষত্রের দূরত্বের মাপার ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে টেলিস্কোপ- তাও নিকটবর্তী নক্ষত্রদের দূরত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। পদ্ধতিটির নাম প্যারালাক্স বা লম্বন (Parallax)। নক্ষত্রের দূরত্বের একক পারসেক এসেছে এ শব্দটা থেকেই। এক পারসেক = ৩.২৬ আলোকবর্ষ। 


প্যারালাক্স বুঝতে হলে হাতের সামনে একটি আঙ্গুল ধরুন। এক চোখ বন্ধ করে এর দিকে তাকান। এবার আরেক চোখ খুলে এই চোখ বন্ধ করে আঙ্গুলের দিকে তাকান। কী ঘটছে? ব্যাকগ্রাউন্ডের সাপেক্ষে আঙ্গুলের অবস্থান বদলে যাচ্ছে। অবস্থানের এই বিচ্যুতির কৌণিক হিসাবকেই প্যারালাক্স বলে। আঙ্গুলের বদলে আরো দূরের কোন বস্তুর ক্ষেত্রে একই পরীক্ষা চালালে দেখা যাবে যে দুই চোখের দেখা অবস্থানের পার্থক্য তথা প্যারালাক্সের মান কমে যাচ্ছে।

প্যারালাক্স। পর্যবেক্ষণের স্থান পাল্টালে পাল্টে যায় বস্তুর অবস্থান। 

এখন, নক্ষত্রদের দূরত্ব নির্ণয়ের জন্যে আমরা এই প্যারালাক্স পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারি। কিন্তু উপরে যেমন বললাম, বস্তুর দূরত্ব বেশি হলে কৌণিক বিচ্যুতিও কম হবে। নক্ষত্রের দূরত্ব বের করার জন্যে পৃথিবীর দুইটি আলাদা জায়গা থেকে একে দেখে নিয়ে ত্রিকোণমিতি কাজে লাগিয়ে দূরত্ব বের করা সম্ভব। এক্ষেত্রে পৃথিবীর আলাদা জায়গা দুটি দুই চোখের মত কাজ করবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, নক্ষত্ররা পৃথিবী থেকে এত বেশি দূরে যে এদের প্যারালাক্সের মান হয় খুবই সামান্য। ফলে খুব ভাল মান পাওয়া যায় না।
 
এ সমস্যার সমাধানের জন্যেও পথ বের করেছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবী বছরে এক বার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। ফলে সূর্যের চারদিকের উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবী ৬ মাস পর পর বিপরীত বিন্দুতে পৌঁছায়। এই দুই বিপরীত অবস্থান থেকে অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী নক্ষত্রের প্যারালাক্সের ভালো মান পাওয়া যায়।
যেমন চিত্রে দেখা যাচ্ছে জুন ও ডিসেম্বর মাসে পৃথিবী কক্ষপথের ঠিক বিপরীত প্রান্তদ্বয়ে থাকে। এই দুই বিন্দুতে কোন নক্ষত্র যে কোণ তৈরি করবে তার অর্ধেকই হল প্যারালাক্স (চিত্রে কোন p)।



এই পদ্ধতিটিও শুধু কাজ করবে পৃথিবী থেকে অপেক্ষাকৃত নিকটবর্তী তারকাদের ক্ষেত্রে। আরো দূরের তারকা বা অন্য কোন বস্তুদের ক্ষেত্রে প্যারালাক্সের মান অনেক কমে যাবে বিধায় ভাল হিসাব পাওয়া যাবে না। 

পারালাক্স পদ্ধতি দিয়ে পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ৪০০ আলোকবর্ষ দূরের তারার দূরত্ব মাপা যায়। আরও দূরের তারার দূরত্ব মাপার সরাসরি কোনো উপায় নেই। তবে নক্ষত্রের রঙ ও উজ্জ্বলতার সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে দূরত্ব জানা যায়। রং থেকে জানা যায় প্রকৃত উজ্জ্বলতা বা দীপ্তি। নক্ষত্রের আলো পৃথিবীতে আসতে আসতে সে উজ্জ্বলতা নিয়ম মেনে কমে। সে নিয়মটা হলো বিপরীত বর্গীয় সূত্র। আর এটা থেকেই জানা যায় নক্ষত্রের দূরত্ব। ছায়াপথের দূরত্ব মাপতেও প্রায় একই ধরনের ধারণা ব্যবহার করা হয়। সৌরজগতের গ্রহ বা সূর্য তো আরও অনেক কাছে। ফলে প্যারালাক্স দিয়েই এদের দূরত্ব বেশ ভালোভাবেই পাওয়া যায়। 
 
১। http://www.astronomy.ohio-state.edu/~pogge/Ast162/Unit1/Images/parallax.png
২। http://curious.astro.cornell.edu/the-universe/79-stars-and-star-clusters/distances/359-how-can-i-measure-the-distance-of-a-star-beginner
৩। https://science.howstuffworks.com/question224.htm
৪। https://www.sciencefocus.com/space/how-do-we-calculate-distances-to-other-galaxies
Category: articles

বৃহস্পতিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৩

সূর্য সৌরজগতের সবচেয়ে বড় বস্তু। যেমন ভারী, তেমনি তার বিশাল অবয়ব৷ সৌরজগতের মোট ভরের ৯৯.৮৬ ভাগ ভরই সূর্যের একার৷ আর আকার? ১০৯টা পৃথিবীকে পাশাপাশি বসালে সূর্যের এপাশ থেকে ওপাশ পর্যন্ত যাওয়া যাবে৷ মানে ব্যাস পৃথিবীর ১০৯ গুণ। 


১০৯টা পৃথিবীকে একটার পর একটা বসিয়ে দিলে সূর্যের সমান চওড়া হবে। 

তবে ফুটবলের মতো প্রায় গোলাকার সূর্যের পেটের ভেতরে বসিয়ে দেওয়া যাবে ১৩ লক্ষ সূর্য৷ এটাই প্রচলিত কথা। সংখ্যাটায় একটু গোলমাল আছে অবশ্য। এ সংখ্যা পাওয়া গেছে সূর্যের আয়তনকে পৃথিবীর আয়তন দিয়ে ভাগ করে। সেটাকেই স্বাভাবিক মনে হয়। তবে এটা সঠিক হত যদি পৃথিবীকে গলিয়ে সূর্যের পেটে ভরে রাখা যেতে। কিন্তু পৃথিবী শক্ত ও কঠিন পদার্থে তৈরি। পৃথিবীকে সূর্যের ভেতরে বসাতে গেলে এখানে-সেখানে ফাঁকা জায়গায় থেকে যাবে। পুরো আয়তন ভর্তি করা যাবে না। ফলে, সবমিলিয়ে সূর্যের ভেতরে জায়গা পাবে নয় ৯ লাখ ৩২ হাজার পৃথিবী। 


সৌরজগত কত বড়?


গোলাকার সূর্যের পেটের ভেতর রাখা যাবে প্রায় ৯ লাখের বেশি পৃথিবী 

সূর্যের আকার প্রায় পুরোপুরি গোলাকার৷ মেরু ও বিষুব অঞ্চলের ব্যবধান মাত্র ১০ কিলোমিটার বা ৬.২ মাইল৷ গড় ব্যাসার্ধ ৪,৩২,৪৫০ মাইল (৬,৯৬,০০০ কিলোমিটার)৷ ব্যাস ৮,৬৪,৯৩৮ মাইল বা ১৩,৯২,০০০ কিলোমিটার৷ তবে সূর্য আকারে চাঁদ ও পৃথিবীর তুলনায় বিশাল হলেও পৃথিবীর আকাশে চাঁদ ও সূর্যকে সমান দেখায়। এর কারণ, সূর্য চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বড়। আবার, পৃথিবী থেকে দূরত্বও ৪০০ গুণ। ফলে পৃথিবীর আকাশে এ দুই বস্তুকে সাধারণত সমান দেখা যায়। তবে সবসময় নয়।  


চাঁদ-সূর্য সমান কেন? 


ভরও দারুণ বিশাল। তিন লাখ ত্রিশ হাজার পৃথিবী একত্র করলে সূর্যের সমান ভর পাওয়া যাবে৷ তবে ভর কিন্তু কমে যাচ্ছে ক্রমশ৷ পরিমাণে সেটা বিশাল হলেও মূল ভরের তুলনায় নগণ্য৷ সৌরবায়ুর সময় সূর্য সেকেন্ডে ১৫ লাখ টন ভর হারায়৷ অভ্যন্তরে চলা ফিউশন বিক্রিয়ায় প্রতিনিয়ত ভর থেকে আলো ও তাপশক্তি তৈরি হচ্ছে৷ এভাবে প্রতি সেকেন্ডে খরচ হচ্ছে ৪০ লাখ টন পদার্থ৷ সব মিলিয়ে সূর্য তার ৪৫০ কোটি বছরের জীবনে ভর হারিয়েছে পৃথিবীর ভরের ১০০ গুণ পদার্থ৷ দেখতে বিশাল লাগলেও এটা সূর্যের ভরের মাত্র ০.০৫ ভাগ। অন্য কথায় দশ হাজার ভাগের ৫ ভাগ৷ সারা জীবনে সূর্য  এক হাজার ভাগের মাত্র ৭ ভাগ ভরকে শক্তিতে রূপান্তর করবে৷ 


তবে সূর্যের বাহাদুরি শুধু সৌরজগতেই। পৃথিবী বা সৌরজগতের অন্যান্য বস্তুর তুলনায় প্রকাণ্ড হলেও সূর্য আসলে সাদামাটা এক তারা৷ রাতের আকাশের নবম উজ্জ্বল তারা বিটলজুস৷ কালপুরুষ তারামণ্ডলের দ্বিতীয় উজ্জ্বল এ তারা সূর্যের প্রায় ৭০০ গুণ বড় ও ১৪,০০০ গুণ উজ্জ্বল৷ বিটলজুসকে জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে ভাল দেখা যায়৷ তবে এমন তারাও আছে যার তুলনায় বিটলজুসও নস্যি! 


লুব্ধক, কালপুরুষ ও বিটলজুস


সূর্যের তুলনায় বিটলজুস কত বিশাল দেখুন। এ তো সবে শুরু। আছে আরও বিশাল বিশাল তারাও।

বিটলজুস তো সূর্যের ৭০০ গুণ বড়। মিউ সিফিয়াই তারা প্রায় এক হাজার গুণ বড় (৯৭২)। সূর্যের চেয়ে এক হাজার গুণ বা আরও বড় প্রায় ১০০ তারা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে ভিওয়াই ক্যানিস মেজোরিস তো ১৪২৯ গুণ বড়। ইউওয়াই স্কুটি ১৭০৮ গুণ। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় আকারের তারার নাম স্টিফেনসন ২-১৮। অন্য নাম স্টিফেনসন ২ ডিএফকে ১। সূর্যের তুলনায় ২১৫০ গুণ বড়। পৃথিবী থেকে দূরত্ব ১৯ হাজার আলোকবর্ষ। 


বড় বড় নক্ষত্রের গল্প


সূর্যের চেয়ে বড় বড় তারকারা

তবে আবার সূর্যের চেয়ে ছোট তারাও আছে। এমন তারাও আছে, যাদের ভর সূর্যের দশ ভাগের এক ভাগ। তবে সূর্যের চেয়ে বেশি ভারী তারা আবার জীবনের শেষ ভাগে অনেক ছোট হয়ে যায়। এই যেমন ব্ল্যাকহোল ও নিউট্রন তারা। জীবনের শেষভাগে ব্ল্যাকহোল তো বিন্দু বা রেখার মতো হয়ে যায়। আর নিউট্রন তারা হয় পৃথিবীর চেয়ে ছোট। জ্বালানি ফুরিয়ে গুটিয়ে যাবার সময় তৈরি নিউট্রন আরও ছোট হতে বাধা দেয়। ফলে তারাটা ব্ল্যাকহোল হতে পারে না। চওড়ায় হয় মাত্র ১২ মাইলের মতো। ঘন এ তারা থেকে একটি চিনির দানার সমান পদার্থ নিলে তার ভরই হবে একশো কোটি টন। 


ব্ল্যাকহোলের জন্ম হয় কীভাবে?


এখন সূর্যের আকার প্রায় ধ্রুব থাকলে আরও প্রায় ৫০০ কোটি সূর্য বড় হয়ে যাবে৷ ততদিনে হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ হওয়ায় বন্ধ হবে হিলিয়াম তৈরির প্রক্রিয়া৷ ফলে ভেতরের অংশ গুটিয়ে একটা সময় লোহিত দানব ও পরে শ্বেত বামন তারায় পরিণত হবে৷ ওদিকে বাইরের অংশে তখনও চলমান ফিউশনের বহির্মুখী চাপে প্রসারিত হয়ে অনেকদূর বিস্তৃত হবে৷ বর্তমান আকার থেকে ২০০ গুণ বড়৷ বুধ ও শুক্রের কক্ষপথ চলে যাবে সূর্যের পেটের ভেতর। এবং সম্ভবত পৃথিবীও। 


সূর্য কীভাবে জ্বলে?


লোহিত দানব তারার গল্প


সূত্র: স্পেস ডট কম, স্লুহ ডট কম, নাসা, আর্থস্কাই, আইএফএল সায়েন্স, ওউক্ল্যাশন

Category: articles

জ্যোতির্বিজ্ঞান পরিভাষা: জেনে নিন কোন শব্দের কী মানে

এখানে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ জ্যোতির্বিদ্যায় প্রয়োজনীয় পরিভাষাগুলোর তালিকা দেওয়া হলো। সাজানো হয়েছে অক্ষরের ক্রমানুসারে। এই তালিকা নিয়মিত আপডেট...