Advertisement

Monday, March 11, 2019

কৌণিক বেগের গল্প


দুই বা তার বেশি বস্তুর মধ্যে দূরত্ব মাপতে আমরা সাধারণত যে রাশি ব্যবহার করি সেটা আসলে মাপে রৈখিক দূরত্ব। যেমন ধরা যাক ছবিতে A ও B এর দূরত্ব ২০ মিটার। এই ২০ মিটার কিন্তু এদের রৈখিক দূরত্ব। আবার ধরা যাক, A ও C এর দূরত্ব ৩০ মিটার। এটাও রৈখিক দূরত্ব।


তবে জ্যোতির্বিজ্ঞান বা ভূগোলে সমবসময় রৈখিক দূরত্ব (linear distance) দিয়ে কাজ চলে না। দরকার হয় কৌণিক (angular) দূরত্বের। রৈখিক দূরত্বের ব্যবহার একেবারেই নেই এমনটা ভাবলেও আবার বড্ড ভুল হয়ে যাবে।  আমরা জানি, আলো প্রতি সেকেন্ডে  ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে। এটা কিন্তু রৈখিক দূরত্বই। আবার পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব তিন লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। এটাও রৈখিক দূরত্ব। এভাবে রৈখিক দূরত্বও কিন্তু খুব কাজে লাগে। 


একইভাবে কাজে লাগে রৈখিক বেগ (linear velocity)। বেগ মানে হলো অবস্থান পরিবর্তনের হার। যেমন ধরুন, একটি বস্তু ১ সেকেন্ডে ১০ মিটার পথ গেল। তাহলে তার বেগ হলো সেকেন্ডে ১০ মিটার। বা কেতাবি ভাষায় $10 ms^{-1}$ । একইভাবে আরেকটি বস্তু যদি ৫ সেকেন্ডে ২০ মিটার যায়, তাহলে তার বেগ হবে $\frac {20}{5}$ বা $4 ms^{-1}$। সহজ কথায় বলা যায়, এক সেকেন্ডে (বা এক মিনিটে, যদি আপনি ভিন্ন মাপকাঠিতে মাপতে চান) নির্দিষ্ট দিকে অতিক্রান্ত দূরত্বই হলো বেগের মান।

কোনো বস্তু একটি নির্দিষ্ট বেগে যেতে থাকলে এই বেগকে বলা হয় সমবেগ (uniform velocity)। এক্ষেত্রে বেগ বের করার সূত্র খুব সোজা। বেগকে v, দুরত্বকে s এবং সময়কে t দিয়ে প্রকাশ করা হলে বেগ হবে,
$$v = \frac{s}{t}$$

এই সূত্রটিরই ব্যবহার একটু আগে আমরা করেছি। তবে বেগ যদি সুষম না হয়, তাহলে আর এই সূত্র কাজ করবে না। অবস্থান পরিবর্তনের হারকে যেমন বেগ বলে, তেমনি বেগ পরিবর্তনের হারকে বলে ত্বরণ (acceleration)। অসমবেগের ক্ষেত্রে ত্বরণের মান কাজে লাগে।

এতক্ষণ আমরা যা বললাম তার সবই কিন্তু রৈখিক কথাবার্তা। কৌণিক দূরত্ব কখন কাজে আসে তার একটি উদাহরণ চিন্তা করা যাক। আমরা জানি, রাতের আকাশে ধ্রুব তারা সবসময় উত্তর আকাশে থাকে। বরাবর উত্তর দিকের দিগন্তের উপরে। সময় গড়াবার সাথে সাথে অন্যান্য তারা পশ্চিম দিকে ঢলে পড়লেও ধ্রুব তারা থাকে প্রায় একই জায়গায়।

আরও পড়ুন
☛ দিক নির্ণয়ে ধ্রুব তারা

ধ্রুব তারা দিয়ে অক্ষাংশ বের করার দারুণ একটি উপায় আছে। কোনো জায়গা থেকে ধ্রুব তারা দিগন্ত থেকে যত ডিগ্রি উপরে থাকবে, ঐ জায়গার অক্ষাংশ হবে তত ডিগ্রি। যেমন বাংলাদেশের অক্ষাংশ প্রায় ২৩ ডিগ্রি। ফলে ধ্রুবতারাকেও উত্তর দিগন্ত থেকে ২৩ ডিগ্রি উপরে চোখে পড়ে। এই যে ভূমি থেকে ২৩ ডিগ্রি উপরের এই দূরত্ব, এটা কিন্তু রৈখিক দূরত্ব নয়। বরং কৌণিক দূরত্ব।

খালি হাতে রাতের আকাশের কৌণিক দূরত্ব মাপার বিস্তারিত উপায় লেখা আছে এখানে

এ তো গেল কৌণিক দূরত্বের কথা। অতএব, আগের মতোই, কৌণিক অবস্থান পরিবর্তনের হারই হলো কৌণিক বেগ। জ্যোতির্বিজ্ঞানে অসংখ্য জায়গায় এর ব্যবহার আছে। যেমন ধরা যাক সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথের কথা। পৃথিবী মোটামুটি এক বছরে সূর্যকে পুরোটা ঘুরে আসে। একইভাবে চাঁদসহ কৃত্রিম উপগ্রহরা ঘোরে পৃথিবীর চারপাশে। এসব হিসাব-নিকাশে দরকার হয় কৌণিক বেগ।

কৌণিক বেগ মাপা হয় বস্তুর সাবেক ও বর্তমান অবস্থানের কৌণিক অবস্থান দিয়ে। অন্য কথায় দুই অবস্থানে উৎপন্ন কোণ দিয়ে।

উপরের চিত্র দেখুন। মনে করুন, একটু বস্তু ০ ডিগ্রি অবস্থানে আছে। এটি ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে যাত্রা শুরু করল। ধরুন ৩০ ডিগ্রি ঘুরল। আরও ধরুন এটা অতিক্রম করতে বস্তুটির ২ সেকেন্ড লাগল। তাহলে বস্তুটির কৌণিক বেগ হলো সেকেন্ডে ১৫ ডিগ্রি। আমরা ধরে নিচ্ছি, বেগ সুষম। মানে, বেগ বাড়ছে-কমছে না।

কোনো বস্তু ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরলে পুরো এক ঘূর্ণন সম্পন্ন হয়। যেমন পৃথিবী সূর্যের চারদিকে পুরোটা একবার ঘুরে এলে ৩৬০ ডিগ্রি ঘোরা হয়। ঘূর্ণন বৃত্তাকার না হলেও (যেমন কক্ষপথ কিন্তু উপবৃত্তাকার) পুরো ঘূর্ণনে ৩৬০ ডিগ্রি-ই হয়।

উপরে আমরা কৌণিক বেগকে ডিগ্রি আর সেকেন্ড দিয়ে প্রকাশ করেছি। তবে কোণের আন্তর্জাতিক একক হলো রেডিয়ান। সেই হিসেবে কৌণিক বেগের একক হলো প্রতি সেকেন্ডে অতিক্রান্ত রেডিয়ান। আমরা জানি, ১৮০ ডিগ্রিকে রেডিয়ান এককে বলা হয় π রেডিয়ান। তাহলে কোনো বস্তু অর্ধবৃত্ত ঘুরলে (উপরের ০ ডিগ্রি থেকে ১৮০ ডিগ্রি অবস্থানে এলে) π রেডিয়ান কৌণিক দূরত্ব অতিক্রম করা হবে। একইভাবে পুরো বৃত্ত ঘুরে অতিক্রম করা হবে 2π রেডিয়ান দূরত্ব। কৌণিক দূরত্বকে সাধারণত θ বা α দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

কৌণিক বেগ বের করার সূত্র হলো,

$$\omega = \frac{\theta}{t}$$

যেখানে $\omega$ (ওমেগা) হলো কৌণিক বেগ।

কৌণিক বেগের জন্যে যে অন্য কারও চারদিকে ঘুরে আসতে হবে এমন কোনো কথা নেই। যেমন পৃথিবী নিজ অক্ষের চারপাশেও ঘুরে। এ কারণেই দিন-রাত হয়। এখানে পুরো এক ঘূর্ণন, মানে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসতে সময় লাগে প্রায় ২৪ ঘণ্টা। মানে এক দিন।

রাতের আকাশের তারা খুঁজে পেতে কৌণিক বেগের কারিশমা দেখতে পড়ুন:
☛ উজ্জ্বল তারাদের গল্প 

কৌণিক দূরত্ব থেকে আমরা সহজেই রৈখিক দূরত্ব বের করতে পারি।

উপরে চিত্রে বৃত্তটির ব্যসার্ধ r। তাহলে এর পরিধি হলো 2πr। মনে করুন, একটি সুতা দিয়ে একটি বৃত্ত বানানো হলো। বানানোর পরে এর ব্যাসার্ধ r হলে সুতার দৈর্ঘ্য ছিল 2πr। পরিধি মানে এটাই। আরেকভাবে চিন্তা করা যায়। বৃত্তটিকে একটি চাকা হিসেবে কল্পনা করুন। তাহলে এই চাকা পুরো একবার ঘুরলে 2πr দূরত্ব অতিক্রম করবে। পুরো একবার ঘূর্ণন! কথাটা চেনা চেনা লাগছে না? হ্যাঁ, পুরো একবার ঘূর্ণনের মানে হলো ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে আসা। রেডিয়ান এককে 2π কোণ। তবে π এর ব্যবহার দুই জায়গায় আলাদা। 2πr এর π-এর মান হলো ৩.১৪১৫... যা একটি অমূলদ ধ্রুবক। বৃত্তের পরিধি ও ব্যাসের ভাগফল। আর 2π কোণ যখন বলা হবে, তখন π মানে হলো ১৮০ ডিগ্রি কোণ। এখানে π এর একক আছে (রেডিয়ান, বা ডিগ্রিতে বললে ১৮০ ডিগ্রি)। কিন্তু 2πr এর π-এর কোনো একক নেই। একটি বিশুদ্ধ সংখ্যা।

উপরের তথ্য কাজে লাগিয়ে আমরা সহজেই কৌণিক আর রৈখিক বেগের সম্পর্ক বুঝতে পারি।

মনে করি, একটি বস্তু ১ মিনিটে পুরো বৃত্ত ঘুরে এল। ধরি, বৃত্তের ব্যসার্ধ (r) ১০ মিটার। বিশাল এক বৃত্ত! তাহলে এর রৈখিক বেগ কত?

উত্তর হবে,
$$v = \frac{2 \pi r}{60} = \frac{2 \pi × 5}{60} = 1.05 ms^{-1}$$

একইভাবে ১ মিনিটে ১৮০ ডিগ্রি (π রেডিয়ান) বা অর্ধবৃত্ত ঘুরে এলে রৈখিক বেগ হবে $\frac{\pi r}{60} ms^{-1}$।

তার মানে, রৈখিক বেগের সাথে কৌণের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে।

বোঝাই যাচ্ছে, কোণের সাথে ব্যাসার্ধ গুণ করে সময় দিয়ে ভাগ দিলেই রৈখিক বেগ পাওয়া যাচ্ছে।
তার মানে, $v=\omega r$

উপরের সম্পর্ক থেকে বোঝা যাচ্ছে, কেন্দ্র থেকে যত দূরে যাওয়া হবে, রৈখিক দূরত্ব তত বেশি হতে হবে। মানে বৃত্তের কেন্দ্র থেকে বেশি দূরে থাকলে সমান কৌণিক দূরত্ব অতিক্রম করতে বেশি রৈখিক দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। বাস্তবে এর অনেক উদাহরণ আছে। যেমন দুটি গাড়ি মোড় ঘুরছে। দুটি গাড়িই কিন্তু সমান কোণ নিয়ে ঘুরবে। কিন্তু যেটি দূরে দিয়ে ঘুরবে সেটিকে বেশি রৈখিক পথ অতিক্রম করতে হবে।


একটু চিন্তা করুন। রাতের আকাশে ধ্রুবতারা একই জায়গায় থাকার সাথে এই ধারণার মিল আছে। 

আরও পড়ুন

আসলে কৌণিক বেগ নিয়ে লিখতে থাকলে কখনও কথা ফুরোবে না। তাই আপাতত ক্ষান্ত দিলাম। 


Advertisement 02

Abdullah Al Mahmud

লেখকের পরিচয়

আব্দুল্যাহ আদিল মাহমুদ। বিশ্ব ডট কমের সম্পাদক ও প্রধান কন্ট্রিবিউটর। পাশাপাশি লিখছেন জিরো টু ইনফিনিটি ,ব্যাপনবিজ্ঞান চিন্তায়। লেখকের এই সাইটের সব লেখা এখানে । প্রকাশিতব্য অনূদিত বই- কালের সংক্ষিপ্ততর ইতিহাস, যা বিজ্ঞান পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়াঃ ফেসবুক। গুগল প্লাস