Advertisement

Tuesday, June 5, 2018

যে-কোনো গোলাকার জিনিসেই মেরু ও বিষুব অঞ্চল নামে দুটো অংশ থাকে। আরও সঠিক করে এ অঞ্চল দুটি থাকে ঘুর্ণনরত গোলাকার বস্তুতে। যেমন গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি। যেমন ধরুন, আমাদের পৃথিবী। এটি ঘুরছে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে। এ কারণেই আমরা সকালবেলা পূর্ব দিকে সূর্য উঠতে দেখি। ডুবে যেতে দেখি পশ্চিমে।

আরও পড়ুনঃ
☛ গ্রহের পরিচয়
নক্ষত্রের পরিচয়

পৃথিবী ঘুরছে পশ্চিম থেকে পূবে। 
এই ঘুর্ণন থেকেই বিষুব ও মেরু অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়। উপরের ছবির একেবারে মাঝখান দিয়ে উপরে-নীচে একটি রেখা কল্পনা করুন। এই রেখাটি পৃথিবীর পৃষ্ঠ বরাবর যাবে না। যাবে পৃথিবীর পেটের ভেতর দিয়ে। উপরের পৃথিবীটাকে ফুটবলের মতো চিন্তা করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এখন এই কল্পিত রেখাকে বলা হয় ঘুর্ণন অক্ষ। মানে যে রেখাকে কেন্দ্র করে পৃথিবী ঘুরছে। এবার কল্পনা করুন এই রেখাটি উপরে ও নীচে কোন বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছেছে। এই দুটিই বিন্দুকেই বলা হয় মেরু (pole)। উপরের বিন্দুটি হলো উত্তর মেরু। অপর নাম সুমেরু। নীচের বিন্দুটির নাম কুমেরু বা দক্ষিণ মেরু। আর মেরু বিন্দু দুটির আশেপাশের অঞ্চলই মেরু অঞ্চল নামে পরিচিত।

এবার উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর মাঝখানে একটি রেখা কল্পনা করুন। অবশ্যই রেখাটি হবে পূর্ব-পশ্চিমে। এই রেখাটিরই নাম বিষুব রেখা (equator)। অপর নাম নিরক্ষ রেখা। এই রেখার উত্তরে পৃথিবীর যে অংশ পড়েছে তার নাম উত্তর গোলার্ধ (Northern hemisphere)। আর দক্ষিণের অংশের নাম দক্ষিণ গোলার্ধ।

পৃথিবীর মেরু ও বিষুব অঞ্চল। 

বিষুব অঞ্চলে পৃথিবীর পরিধি সবচেয়ে বেশি হয়। বিষয়টা খুব সহজ। উপরের ছবিতে দেখুন, বিষুব রেখা থেকে আমরা যতই উত্তরে বা দক্ষিণে যাব, ততই পূর্ব ও পশ্চিমের ব্যাবধান কমে যাচ্ছে। তার মানে অক্ষ রেখা থেকে পৃষ্ঠের দূরত্ব কমে যাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হলে ফুটবলের কথা আবার মনে করুন। এভাবে যেতে যেতে মেরুতে গিয়ে দেখুন, পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে কোন ব্যবধানই নেই। দুটো একে অপরের সাথে মিশে গেছে।

এবার আরেকভাবে চিন্তা করি। আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, বিষুব অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ বেশি। মেরু অঞ্চলে কম। হ্যাঁ, এটা সত্যি। তবে একটু আগে আমরা যে ব্যাসার্ধের কথা বলেছি, সেটা ছিল অক্ষ রেখা থেকে পরিধির দূরত্ব। মানে উত্তরে-দক্ষিণে কল্পিত রেখার প্রতিটি বিন্দু থেকে পৃথিবীর পৃষ্ঠের দূরত্ব। তবে এবারে আমরা চিন্তা করছি পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্র থেকে দূরত্ব। এই ব্যসার্ধ আপাত দৃষ্টিতে মেরু ও বিষুব অঞ্চলে সমান হওয়ার কথা। কিন্তু আসলে তা নয়।

উপরের ছবি দুটোতে আমরা পৃথিবীকে একদম খাঁটি গোলকের মতো চিন্তা করেছি। পৃথিবী সেরকমই হতো যদি এটি স্থির থাকত। কিন্তু পৃথিবী ঘণ্টায় দেড় হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বেগে পশ্চিমে থেকে পূবে ঘুরছে। এই ঘূর্ণনের কারণেই বিষুব অঞ্চলটা একটি লম্বা হয়ে গেছে। অন্য দিকে মেরু অঞ্চলটা একটু চেপে গেছে। তার মানে পৃথিবীর সঠিক আকৃতি হবে এ রকম:
দেখুন মেরুর দিকে ব্যাসার্ধ b দিয়ে বোঝানো হয়েছে। আর বিষুব রেখায় ব্যাসার্ধ a। অবশ্যই a বড় b এর চেয়ে। ছবি থেকে বোঝাও যাচ্ছে কেন এমন হল। ছবির সূত্র

আরও পড়ুন: 
পৃথিবী কত জোরে ঘোরে?

এবারে আরও কিছু অঞ্চল চিনে নেওয়া যাক। উত্তর মেরু থেকে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি দক্ষিণ পর্যন্ত এলাকা নিয়ে একটি বৃত্ত আঁকলে যে এলাকা পাওয়া যায়, তাকে বলে সুমেরু বৃত্ত (arctic circle)। একইভাবে দক্ষিণ মেরুর উত্তর দিকে বৃত্ত আঁকলে তার নাম হয় কুমেরু বৃত্ত (antarctic circle)।

সুমেরু বৃত্ত ও আশেপাশের অঞ্চল। 
আবার বিষুব রেখা থেকে ২৩.৫ ডিগ্রি উত্তরে পূর্ব-পশ্চিমে কল্পিত রেখাকে বলে কর্কটক্রান্তি রেখা (tropic of cancer)। অন্য দিকে, একই কৌণিক দূরত্বে দক্ষিণের রেখাকে বলে মকরক্রান্তি রেখা (tropic of capricorn)। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের কর্কটক্রান্তি রেখা আমাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে চলে গেছে। আরও নিখুঁত করে বলা যায়, ঢাকার উপর দিয়ে চলে গেছে।

আরও পড়ুন: 
☛ পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ মেরু থাকলেও পূর্ব পশ্চিম মেরু নেই কেন?
Category: articles

Wednesday, February 1, 2017

প্রাচীনকালের মানুষজন পৃথিবীকে সমতল মনে করত। এ বিশ্বাস শুরু হয়েছিল সুমেরীয়দের দিয়ে। তারাই ছিল প্রথম সভ্যতা, যারা লিখতে পারত। তারা ধরে নিয়েছিল, পৃথিবী একটি বিশাল সমতল মাঠ। তাদের ধারণার পেছনে যথেষ্ট যুক্তিও ছিল। কারণ সাধারণভাবে দেখলে মনে হবে, পৃথিবীর উঁচু ও নিচু স্থানগুলোকে মিলিয়ে সমতল করে ফেলা সম্ভব। তাছাড়া শান্ত পুকুর বা হ্রদের পানির দিকে তাকালে তা সমতল দেখায়। ভিন্নভাবে দেখলে, পৃথিবীর বক্রতা মেপেও বোঝা যায় তা আসলে সমতল নাকি গোলাকার। পরিমাপ করলে দেখা যাবে পৃথিবীর প্রতি মাইলে বক্রতার ব্যাসার্ধ শুন্য! যেখানে ১ মিটার ব্যাসার্ধের কোনো গোলকের বক্রতা প্রতি মিটারে ১ একক।

 বক্র পৃথিবী 

কিন্তু আজ আমরা সবাই জানি, পৃথিবী সমতল নয়। বরং প্রায় কমলালেবুর মতো গোলাকার। তবে প্রাচীনকালের যন্ত্রপাতি দ্বারা প্রাপ্ত পৃথিবীর সমতল তত্ত্ব প্রায় সঠিক ছিল। এ কারণে অনেক দিন ধরেই মানুষ পৃথিবীকে সমতল ভাবত।

তবে পৃথিবী সমতল হলে কিছু সমস্যা থেকেই যায়, যা ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। যেমনঃ ৩৫০ খ্রিস্টপূর্বে বিখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল দেখলেন, পৃথিবীকে সমতল ধরলে তিনটি প্রাকৃতিক ঘটনার কারণ সঠিকভাবে বর্ণনা করা যায় না। প্রথমটি হল, যদি কেউ উত্তর দিকে ভ্রমণ করতে থাকে, তবে তার কাছে রাতের আকাশের কিছু তারা দিগন্তে মিলে যাচ্ছে বলে মনে হবে। আবার দক্ষিণ দিকে ভ্রমণ করলেও অন্য কিছু তারা দিগন্তে মিলে যায়। দ্বিতীয়টি হল, চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের গায়ে পৃথিবীর ছায়া সব সময় গোলাকার দেখায়। তৃতীয় ঘটনা, সমুদ্রে কোনো জাহাজ যেদিকেই ভ্রমণ করুক না কেন জাহাজের কোল সবার আগে অদৃশ্য হয়ে যায়। এছাড়াও তিনি মনে করতেন সব বস্তুই গোলকে রুপান্তরিত হতে চায়।

অ্যারিস্টটল  
অ্যারিস্টটলের প্রায় ১০০ বছর পরে ইরাটোস্থেনিস নামে আরেকজন বিজ্ঞানী খেয়াল করেন, একই বস্তুর ছায়া পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে যদি একই সময়ে পরিমাপ করা যায়, তবে ছায়ার দৈর্ঘ্য বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন হয়।
 
ছায়ার এই দৈর্ঘ্যের পার্থক্য থেকে তিনি পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেন ২৮ হাজার ৬৫০ মাইল। যার বক্রতার ব্যাসার্ধ দাঁড়ায় প্রতি মাইলে ০.০০০১২৬। এই মানটি শূন্যের খুব কাছাকাছি। প্রাচীনকালের যন্ত্রপাতি দিয়ে তা পরিমাপ করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তাই সেই সময় পৃথিবীর সমতলতত্ত্ব নিয়ে কেউ তেমন দ্বিমত পোষণ করেনি।

ইরাটোস্থেনিস 

তারপরেও পৃথিবী কি সম্পূর্ণ গোলক? টেলিস্কোপ দিয়ে শনি ও বৃহস্পতি গ্রহ পর্যবেক্ষণ করা হলে দেখা গেল, তারা পুরোপুরি গোলক নয়। বরং উপবৃত্তাকার। ১৭ শতকের শেষের দিকে আইজ্যাক নিউটন দেখিয়েছিলেন, যদি বিশালাকার কোনো বস্তু ঘূর্ণায়মান থাকে, তবে একটা কেন্দ্রবিমুখী বল তৈরি হবে, যার মান বিষুবীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি হবে। এই বলের কারণে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ বস্তুসমুহ অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে পৃথিবী ছেড়ে বাইরে চলে যেতে চাইবে। যেহেতু বিষুবীয় অঞ্চলে এই বল সর্বাধিক, তাই এই অঞ্চলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ সর্বোচ্চ হবে। অষ্টাদশ শতকে পরিমাপ করে দেখা গেল নিউটন ঠিকই বলেছিলেন। পৃথিবী আকৃতি আসলে কমলালেবুর মত। তখন প্রতি মাইলে পৃথিবীর ব্যাসার্ধের পার্থক্য পাওয়া যায় ০.০০৩৪।

নিউটন 

তাহলে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াল?
পৃথিবীর বক্রতা প্রাথমিকভাবে প্রতি মাইলে শূন্য। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে ০.০০০১২৬ ,যা প্রতি মাইলে ৭.৯৭৩ থেকে ৮.০২৭ ইঞ্চি পর্যন্ত পরিবর্তিত হতে পারে। তাই সমতল পৃথিবীর ধারণা যেমন ভুল ছিল, গোলাকার পৃথিবীর ধারণাটিও তেমনি ভুল। কিন্তু সেই ভুলের পরিমাণ সমতল পৃথিবীর ধারনার চেয়ে অনেক অনেক কম।

ঠিক এরকমভাবেই আজ আমরা যা জানি, তা আমাদের কাছে এখন  সঠিক ও নির্ভুল মনে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের জ্ঞান আরেকটু সমৃদ্ধ হলে নিজের জানা সঠিক বিষয়টাই হয়ত এক সময় ভুল বলে মনে হতেই পারে। এই মহাবিশ্বের অসীম জ্ঞান সমুদ্রের তুলনায় আমরা যে নিতান্তই মূর্খ!

আরও পড়ুনঃ
পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ মেরু থাকলেও পূর্ব পশ্চিম মেরু নেই কেন?

তথ্যসূত্রঃ 
১। ইউটিউব
২। উইকিপিডিয়া
Category: articles

Thursday, December 22, 2016

আপনারা আকাশে কখনও কি আলোর নৃত্য দেখেছেন? অনেকেই হয়তো ভাবছেন আতোশবাজি বা অন্যান্য জিনিসের কথা। কিন্তু প্রকৃতি যে নিজেই আলোর নৃত্য দেখায়। এরই নাম অরোরা (Aurora)। আলোর এই নাচন চোখে পড়ে সাধারণত পৃথিবীর দুটি মেরু অঞ্চলে। সুমেরু (Arctic) ও কুমেরুর (Antarctic) আকাশে। 

মেরু অঞ্চলে সৃষ্ট অরোরা 

অরোরা শব্দতি এসেছে ল্যাটিন থেকে। অর্থ Sunrise বা সূর্যোদয়। এই মেরুজ্যোতি বা মেরুপ্রভা (Polar aurora) পৃথিবীর দুই মেরুর  আকাশে ঘটে যাওয়া এক নৈসাদৃশ্য ঘটনা। উত্তরে মেরুতে ঘটলে নাম হয় সুমেরু প্রভা (Northern Lights বা Auorora Borealis),আর দক্ষিণ মেরুতে এরই নাম কুমেরু প্রভা (Southern Lights বা Aurora Australis)। 

এই অরোরা দেখতে আপ্রাকিতিক দৃশ্য বলে একে এক রহস্যময় শক্তি বলে বিবেচনা করা হত। অধিকাংশ মানুষই একে স্বর্গীয় আলো মনে করত। অনেকে আবার একে সৃষ্টিকর্তার পক্ষ হতে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা মনে করত। সবুজ রঙের প্রভাকে তারা ভাবতো তাদের ভবিষ্যতের সুখের আভাস। আর এর রঙ লাল হলেই তাদের মনে হত ভবিষ্যৎ হবে দুর্যোগময়। লোহিত মেরুপ্রভাকে যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবেও দেখা হত।

অরোরা দেখতে অনেকটা অনেকগুলো সমান্তরাল আলোক রশ্মির মতো, যা একটির পর একটি করে ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে তৈরি করে আলোক পর্দার মতো। প্রতি মুহূর্তে হতে থাকে স্থানান্তরিত। রাতের বেলা মনে হয় অনেকগুলো সমান্তরাল আলোক রশ্মি পৃথিবীর বুকে নেমে আসছে। মূলত এই আলোক পর্দাই প্রতিনিয়ত স্তানন্তরিত হতে থাকে। আর এটা মনে হয় যেন পৃথিবীর বুকে সমুদ্রের ঢেউ খেলছে। এই অরোরা বিভিন্ন রঙের হতে পারে।


অরোরা তৈরির কারণঃ

সূর্য প্রতিনিয়তই পৃথিবীর চারদিকে বিভিন্ন চার্জিত কণা নিক্ষেপ করছে, যা আমাদের জন্য ক্ষতিকর। সূর্যের এই চার্জিত কণার প্রবাহকেই বলে সৌরবায়ু (solar wind)। কিন্তু সৌভাগ্যের ব্যাপার হল, আমাদের পৃথিবীতে রয়েছে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic field) । এটি দক্ষিণ মেরু থেকে উত্তর মেরুতে প্রবেশ করছে। সূর্য থেকে যখন এসব আয়নিত কণা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তখন এরা পৃথিবীর আয়োনিত চৌম্বক ক্ষেত্র দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। তাই তা ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু মেরু অঞ্চল যেখানে চৌম্বক ক্ষেত্র একদম কম সেখানে এই আয়নিত কণাগুল প্রবেশের সুযোগ পায় এবং এ অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলে অবস্থিত নাইট্রোজেন ও অক্সিজেনকে আঘাত করে। তখন এদের পরমাণু উত্তেজিত হয় এবং কিছুক্ষণ পরেই শক্তি বিকিরন করে আগের অবস্থায় ফিরে আসে। আর এই বিকিরণই আমরা দৃশ্যমান আলোতে দেখতে পাই। আর এটাই হল অরোরা। 

অরোরায় আলোর নাচন 

বায়ুমণ্ডল আছে এমন কোনো গ্রহে যদি দ্রুতগতির চার্জিত কণা প্রবেশ করে তবেই মেরুপ্রভা সৃষ্টি হবে। সৌরবায়ু যেহেতু সকল গ্রহেই পৌঁছে, তাই সব গ্রহেই অরোরা বা মেরুপ্রভা সৃষ্টি হয়। তবে গ্রহভেদে এদের রুপ ভিন্ন। শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র বিশিষ্ট শনি ও বৃহস্পতি গ্রহে পৃথিবীর ন্যায়
মেরু অঞ্চলে অরোরা উৎপন্ন হয়। শুক্রের মতো গ্রহের ক্ষেত্রে যেখানে উল্লেখযোগ্য চৌম্বকক্ষেত্র নেই, সেখানে অনিয়মিত প্রভা উৎপন্ন হয়। যে সকল গ্রহের চৌম্বক অক্ষ এবং ঘূর্ণন অক্ষ এক নয়
(যেমন ইউরেনাস ও নেপচুন), সেখানে বিকৃত (Distorted) মেরুপ্রভ অঞ্চল সৃষ্টি হয়। 

আজকের ছবিঃ বৃহস্পতির অরোরা
বৃহস্পতি গ্রহে সৃষ্ট অরোরা 
Category: articles

Friday, December 9, 2016

একটি গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। দুই বন্ধু ইকরাম ও রিফাত ভ্রমন করতে খুবই পছন্দ করে। ইকরাম একজন ভালো ফটোগ্রাফার আর রিফাত বেশ সাহসী। তো, একদিন তারা আমেরিকার ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে  ঘুরতে গেল। ইকরাম প্রকৃতির ছবি তুলতেছিলো, তখন রিফাত পানির একটি রিজার্ভারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, 'দোস্ত, আমার একটা ছবি তোল।'

ইকরাম ক্যামেরা ফোকাস করে যখনি ক্যাপচারিং বাটনে ক্লিক করবে তখনি রিফাতের পাশে মাটি থেকে হঠাৎ ধোঁয়া বের হতে দেখল। আর, অমনি চিৎকার করে উঠল। রিফাত তাকে সান্তনা দিয়ে বলল, 'শোন, বাচ্চা ছেলের মত ভয় পাস না, বরং দেখি কী ঘটে?

তারপর মাটি ফেটে তীব্র বেগে উর্ধমূখে পানি বের হতে লাগল। আশ্চর্য হয়ে গেল ওরা। আর একসাথে বলে উঠল "দারুণ তো!"।

গেইসার 

আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এরই নাম আসলে গেইসার।

গেইসার হল ভূ-অভ্যন্তর থেকে উৎক্ষিপ্ত গরম পানি বা বাষ্প। জলভূতাত্ত্বিক (Hydrogeological) কারণে পৃথিবীর পাতলা ভূ-ত্বক ভেদ করে এটি বেরিয়ে আসে। পিচকারি বা ফোয়ারার মতো উর্ধ্বমুখী হয়ে বিস্ফোরণের আকারে নির্দিষ্ট সময় পরপর বেরিয়ে আসে। উচ্চতা হয় সর্বোচ্চ ২০০ ফুট পর্যন্ত। স্থায়িত্ব হয় সর্বোচ্চ ১০ মিনিট।


এটি একটি বিরল ঘটনা। বর্তমানে পৃথিবীব্যাপী প্রায় ১০০০  গেইসার আছে। আমেরিকার Yellowstone National Park এ আছে প্রায়  ৪৬৫ টি সক্রিয় গেইসার। এখানেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ওল্ড ফেইথফুল গেইসার সক্রিয়। এটি থেকে  প্রতি ৩৫-১২০ মিনিট পর পর প্রায়  ১.৫- ৫ মিনিট ধরে প্রস্রবণ ১০৬-১৮৫ ফুট পর্যন্ত  উৎক্ষিপ্ত হয়।


এছাড়া  রাশিয়ার Dolina Geiserov, চিলির El Tatio, নিউজিল্যান্ডের Taupo Volcanic Zone আইসল্যান্ডের পুরো অঞ্চলের গেইসার উল্লেখযোগ্য।
পৃথিবী জুড়ে  গেইসারের বিস্তৃতি 


গেইসার সৃষ্টির প্রক্রিয়া : 
তিনটি ভূতাত্বিক কারণে গেইসার তৈরী হয়ঃ-

১. প্রচন্ড তাপ:
ভূ-অভ্যন্তরে প্রচণ্ড তাপ সৃষ্টিকারী পদার্থ যেমন গরম শিলা, ম্যাগমা ইত্যাদির উপস্থিতি গেইসার সৃষ্টির জন্য অপরিহার্য। এজন্য আগ্নেয়গিরি প্রবণ এলাকায় এটি ঘটে থাকে।

২. পানির উপস্থিতি: 
পৃথিবীর পৃষ্ঠে বড় ধরনের পানির রিজার্ভার এর উপস্থিতিতে অভিকর্ষের টানে পৃথিবীর ২০০০ মিটার পর্যন্ত পানি নিচে নেমে প্রচণ্ড তাপের সংস্পর্শে আসা অপরিহার্য।

৩. পাতলা ভূত্বক ও জলনির্গমন প্রণালী: 
পানি গরম হয়ে  ঊর্ধমুখী চাপে জলনির্গমন পথে  (conduit) বের হওয়ার জন্য ভূত্বক পাতলা হওয়া প্রয়োজন।

গরম পানি চারটি ধাপে উৎক্ষেপিত হয় : 
১. গরম পানি হতে বাষ্প বের হওয়া
২. টগবগানো পানি ঊর্ধমুখে স্ফীত হওয়া (একটি পানি বুদবুদের মতো অবস্থা, যেটির যেকোনো সময় ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে)
৩. পাতলা  ভূপৃষ্ঠ ভেঙ্গে যাওয়া
৪. পানি তীব্র বেগে উর্ধমুখে স্প্রে হওয়া


সূত্র: উইকিপিডিয়া,  ইউটিউব
[লেখাটি ইতোপূর্বে ব্যাপন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত] 
Category: articles

Tuesday, October 4, 2016

আচ্ছা বলুনতো, গাড়ি কোন পথে চলতে পারে? নিশ্চয়ই সমতল, ঢালু, আকাবাঁকা সব ধরনের পথেই গাড়ি চলবে। উত্তর সঠিক। এবার তাহলে বলুন, গাড়ির ইন্জিন বন্ধ করে দিলে এটি কোথায় কোথায় চলবে? এবার নিশ্চয়ই বলবেন, শুধু ঢালু পথ ধরে উপর থেকে নিচে সেটা হতে পারে। আমি যদি বলি, ঢালু পথে ইঞ্জিন বন্ধ করে রাখা গাড়িও নিচ থেকে উপরেও উঠতে পারে- এমনকি তা হতে পারে ঘন্টায় ১২০ কিলোমিটার বেগে, তবে কি বিশ্বাস করবেন?

সাধারণত একটি বস্তু নিজে নিজেই ঢালু পথে উপর হতে নিচে নামে। কারণ পৃথিবী অভিকর্ষ বল দ্বারা প্রতিটি বস্তুকে কেন্দ্রের দিকে টানে। কিন্তু এমনটা অস্বাভাবিক মনে হয় যখন কোনো বস্তু পাহাড়ের ঢালু পথে নিচ থেকে উপরে ওঠে কোনো প্রকার বল প্রয়োগ ছাড়াই। আশ্চর্যজনক হলেও আপাত দৃষ্টিতে এমনটি সত্য। এই বিশেষ ধরনের পাহাড়ের নাম গ্র্যাভিটি হিল। এর আরেক নাম ম্যাগনেটিক হিল।



আপাত দৃষ্টিতে দেখে মনে হচ্ছে কোনো শক্তি খরচ না করেই নিচ থেকে উপরে উঠা যাচ্ছে। আসলে কিন্তু এ সাইকেলের আরোহী উপর থেকেই নিচে নামছেন। কিন্তু দৃশ্যপট এমন হয়ে আছে যে উল্টোটাই মনে হচ্ছে। 

অনেকেই একে  রহস্যময় পর্বত বা রহস্যময় স্থান হিসেবে অভিহিত করে থাকেন, এমন কিছু স্থান যেখানে পরিপার্শ্বিক দৃশ্যপট এমন একটি দৃষ্টি বিভ্রম সৃষ্টি করে, যাতে একজন দর্শকের কাছে ঐ স্থানের একটি নিম্মমুখী ঢাল বিশিষ্ট রাস্তাকে উর্ধ্বমুখী ঢালু মনে হতে থাকে। এ সকল স্থানে কোনো গাড়ির গিয়ার বন্ধ করে রাখলেও তা আপনা আপনি চলতে থাকে। এতে করে চালক বা দর্শকের কাছে গাড়িটি উঁচু রাস্তা বেয়ে উঠে যাচ্ছে বলে মনে হয়। অথবা রাস্তায় পানি ঢালা হলে তা গড়িয়ে উঁচু রাস্তায় উঠছে বলে মনে হয়। এই পৃথিবীতে এরকম প্রায় একশ পাহাড় আছে । যেমন কানাডার কুইবেকের চারটিয়ারভিল, সৌদি আরবের মদিনার ওয়াদি ই জ্বিন, অস্ট্রেলিয়ার ওরোরা, ভারতের লাদাখে ইত্যাদি।

এসব পাহাড় পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। অনেকে মনে করেন, অতপ্রাকৃতিক শক্তি (supernatural force) বা চুম্বকীয় বলের এর কারণে এমনটি হয়ে থাকে, যা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার বিপরীত। তবে বিজ্ঞানীরা গ্রাভিটি হিলের রহস্য বের করেছেন।

সৌদিআরবের মদিনার ওয়াদি ই জ্বিন

বিজ্ঞানীরা জিপিএস ব্যবহার করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটা মরীচিকার মতই একটি দৃষ্টি ভ্রম, যা আলোক বিভ্রমের (optical illusion)  জন্য হয়ে থাকে। আশেপাশের গাছপালা, ঢালু এলাকা, আকাবাঁকা দিগন্তরেখা বা বাধাগ্রস্থ দৃষ্টিসীমার কারণে মানব চোখ ঐ এলাকার ঢাল নির্ণয়ের জন্য কোনো প্রসঙ্গ কাঠামো খুঁজে পায় না বলে মস্তিষ্কে এমন অনুভূতি সৃষ্টি হয় যাতে ঐ এলাকাটিকে
ঊর্ধমুখী ঢাল বলে মনে হয়।

গ্র্যাভিটি হিলের আরেকটি উদাহরণ 
Category: articles

Sunday, June 19, 2016

প্রশ্নঃ পৃথিবী যদি সেকেণ্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে নিজ অক্ষের উপর ঘুরতে থাকে তাহলে মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে স্থির দেখায় কেন?
অত জোরে নিজ অক্ষের উপর ঘুরলে তো মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় বাংলাদেশে অবতরণ করতে গেলে তো আমেরিকায় চলে যাওয়ার কথা! আর মহাকাশ থেকে তো পৃথিবীকে পাগলের মত ঘুরতে দেখা যায় না, তাহলে এর ব্যাখ্যা কি?
[রাকিব হাসান]

উত্তরঃ
প্রথমত, পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর সেকেন্ডে ৩০ কিমি. বেগে ঘুরছে না। বিষুব অঞ্চলে পৃথিবীর আবর্তন বেগ হল ঘণ্টায় ১৬৭০ কিলোমিটার বা সেকেন্ডে প্রায় ৪৬৪ মিটার। আপনি যেটি উল্লেখ করেছেন সেটি হল সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ বেগ। কিন্তু তাতে আপনার প্রশ্ন বাতিল হচ্ছে না।
আরও পড়ুনঃ 
 ☛ পৃথিবীর আবর্তন বেগ কত?
 ☛ আবর্তন ও প্রদক্ষিণের পার্থক্য কী?

পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ঘুরছে। দুই মেরুর ঠিক মাঝখানে বিষুব অঞ্চল অবস্থিত।
তাছাড়া আবর্তন বেগ পৃথিবীর সব জায়গায় সমান নয়। বিষুব রেখা থেকে উত্তরে বা দক্ষিণে আবর্তন বেগ কমে যায়। আমাদের বাংলাদেশে পৃথিবীর আবর্তন হচ্ছে সেকেন্ডে ৪২৪ মিটার করে।
কিন্তু তবু প্রতি সেকেন্ডে ৪৬৪ বা ৪২৪ মিটার বেগও খুব একটা ছোট নয়। এই গতিতে যেতে থাকলে কোনো বাস তিনি সেকেন্ড পার হবার আগেই এক কিমি. পথ পার হয়ে যাবে। তাহলে পৃথিবীর এই ঘূর্ণন মহাকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে না কেন?

একটা গল্প শুনি। একবার রাশিয়ায় একজন লোক দাবি করলেন তিনি খুব সহজে ভ্রমণ করার একটি কৌশল বের করেছেন। দরকার হবে শুধু একটি বেলুন। ধরুন কেউ বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ যেতে চাইছেন। তাহলে বাংলাদেশ থেকে একটি বেলুনে চেপে উপরে উঠে যেতে হবে। ইতোমধ্যে পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে বেলুনের নিচে ইউরোপ এসে যাবে। এখন নেমে পড়লেই হল। খুব সহজ ভ্রমণ। বিমান আবিষ্কারের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই এভাবে মিটে যেত।
এই কৌশল বাস্তবে কাজ করে না। এর কারণ হল, আমরা যখন বেলুনে চেপে উপরে উঠব, তখনো আমরা পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মধ্যেই থাকব। ঘুরতে থাকব পৃথিবীর সাথেই। এটা যদি না হত তাহলে আমাদের কষ্ট করে বেলুনে চড়ার দরকার ছিল না। মাটি থেকে এক লাফ দিয়ে উপরে উঠে ৩ সেকেন্ড পরে নামলেই দেখা যেত এক কিলোমিটারের বেশি পশ্চিমে চলে গেছি। বাস্তবে আমরা যখন আকাশ পথে ভ্রমণ করি, তখনো পৃথিবীর সাথে সাথে ঘুরতেই থাকি।
বিমান নিজেও পৃথিবীর সাথে সাথে ঘুরতে থাকে 
এ জন্যেই বিমান থেকে তাকালেও আমরা পৃথিবীকে স্থিরই দেখব।
মূল কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ এতটা শক্তিশালী যে আমরা এর থেকে অনেক উপরে উঠলেও এর অভিকর্ষীয় টানের সীমানার মধ্যেই থেকে যাই। আর এই টানের কারণেই কিন্তু পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডল আছে। আমাদের মাথার উপরে যে বায়ুমণ্ডল সেটিও পৃথিবীর সাথে সাথে ঘুরছে। আরেকটি মজার ব্যাপার হল, একটু আগে বলেছি কেউ লাফ দিলে তিন সেকেন্ডে এক কিলোমিটারেরর বেশি পথ যেতে পারবেন। আসলে যাবেন ঠিকই। কিন্তু পৃথিবী যদি তাকে নিজের অভিকর্ষ দ্বারা ধরে না রাখত তবে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরার কারণে কিছুক্ষণ পরই তিনি পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে যেতেন। পৃথিবী ছুটে চলে যেত কক্ষপথ ধরে। এছাড়াও পৃথবীর অভিকর্ষ যদি যথেষ্ট শক্তিশালী না হত, তবে আমরা কেন্দ্রবিমুখী বলের কারণে এর পৃষ্ঠ থেকে আলাদা হয়ে যেতাম।
আরও পড়ুনঃ
পৃথিবীর আবর্তনের কারণে আমরা পড়ে যাই না কেন?

আবার বেলুনের ঘটনায় ফিরে আসি। বেলুনকে কি এমন কোনো উচ্চতায় পাঠানো সম্ভব না, যেখানে এটি পৃথিবীর সাথে ঘুরবে না? নিচে এসে আমরা দেখব পায়ের তলার পৃথিবী ঠিকই ঘুরে গেছে?
হ্যাঁ, সম্ভব। সেক্ষেত্রে বেলুনকে অনেক বেশি বেগ দিয়ে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে এটা বেলুন দিয়ে সম্ভব না। এই কাজ করা হয় রকেটের মাধ্যমে। এর জন্যে রকেটের প্রাথমিক বেগ হতে সেকন্ডে অন্তত ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার। এই বেগকে বলা হয় মুক্তি বেগ।
আরও পড়ুনঃ 
মুক্তি বেগের পরিচয়

এখন কথা হল, পৃথিবীর উপরের সব জায়গা থেকেই কি পৃথিবীকে স্থির দেখায়? অবশ্যই না। শুধু পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের অভ্যন্তর থেকেই এমনটা দেখাবে। আমরা টেল্কিস্কোপ দিয়ে সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহদের আবর্তন দেখি, কারণ আমরা এদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের এতটা ভেতরে নই যে এরা আমাদেরকেসহ ঘুরবে। একইভাবে আমরা যদি যথেষ্ট দূরে গিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকাই তাহলে একেও ঘুরতে দেখব। আবর্তন ও প্রদক্ষিণ দুটোই দেখা যাবে।
দেখুন নিচের ভিডিও অনেক দূর থেকে সৌরজগৎসহ বিভিন্ন নক্ষত্রদের ঘূর্ণন দেখা যাচ্ছে। কারণ এই ছবি তোলা হয়েছে এদের অনেক দূর থেকে, এদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতর থেকে নয়।

এখন বাকি প্রশ্ন হল, মহকাশযান ফিরে আসার সময় এক জায়গায় অবতরণ করতে গিয়ে আরেক জায়গায় চলে যায় না কেন? এটাও এতক্ষণে মোটামুটি স্পষ্ট হবার কথা। মহাকাশযান ফিরে আসার বিভিন্ন কৌশলে প্রথমে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে প্রবেশ করে। পরে স্বাভাবিকভাবে অবতরণ করে।
মহাকাশযানের ভেতরে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা থাকে এটি কখন, কীভাবে কোথায় অবতরণ করবে। ফলে পৃথিবীর আবর্তনের কারণেতো দূরের কথা, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরলেও কোনো সমস্যা হয় না। 
Category: articles

Friday, February 19, 2016

১৯ ফেব্রুয়ারি, ১৪৭৩। আজকের এই তারিখটি হচ্ছে নিকোলাস কোপার্নিকাসের জন্মদিন। তিনি একইসাথে গণিতজ্ঞ হলেও নজর কেড়েছেন কসমোলজিতে বিশেষ অবদান রেখে।
এমন এক সময়ে তাঁর জন্ম যখন মানুষ ভাবত মহাবিশ্বের কেন্দ্রে পৃথিবীর অবস্থান। সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহ এবং নক্ষত্ররা ঘুরছে এর চারদিকে।
পৃথিবী-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের চিত্র

এই মহা ভুল ধারণা দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করল তাঁর বই De revolutionibus orbium coelestium (On the Revolutions of the Celestial Spheres) বা খ-গোলকের ঘূর্ণন যাতে প্রস্তাবনা আসল সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের। ১৫৪৩ সালে  প্রকাশিত বইখানা আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার অন্যতম ভিত্তি।
কয়েক বছর আগে Copernicus’ birthday লিখে গুগলে সার্চ দিলে সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের একটি ডুডল দেখা যেত। ছুটির দিন বা কারো জন্ম দিন ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে গুগল ডুডল বানিয়ে থাকে।
নিকোলাস কোপার্নিকাস

তবে সৌরকেন্দ্রিক মডেল প্রথম প্রস্তাবক অবস্য কোপার্নিকাস নন। গ্রিক দার্শনিকদের অনেকেই ভাবতেন এই রকম চিন্তা। ইসলামিক জ্যোতির্বিদ্যার অগ্রগতির সাথে সাথেও ধীরে ধীরে পৃথিবীর বেগ নিয়ে ধারণার বিকাশ ঘটে এবং পৃথিবীকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র থেকে সরানো হয়। তবে গ্রিকদের ক্ষেত্রে অন্য অনেক কিছুর মতই বাগড়া দিয়ে বসেছিলেন এরিস্টটল। তিনি বললেন, ৫৫টি এককেন্দ্রিক এবং স্বচ্ছ গোলক নিয়ে আকাশ গঠিত যেখানে আকাশের বস্তুদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ঐ গোলকের কেন্দ্রে আছে পৃথিবী। পৃথিবী এতে স্থির এবং আবদ্ধ। পৃথিবীকে এই বন্দী দশা থেকে মুক্ত করলেন কোপার্নিকাস।
এখন আমরা জানি সূর্যও কিন্তু মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। তাহলে কে আছে কেন্দ্রে? নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগছে। পড়ুনঃ মহাবিশ্বের কেন্দ্র কোথায়?
সূত্রঃ
[১] Earth Sky
[২] উইকিপিডিয়াঃ জিওসেন্ট্রিক মডেল
Category: articles

Friday, January 1, 2016

২০১৬ সালের ২ জানুয়ারি। এই তারিখে সূর্যের নিকটতম স্থানে পৃথিবীর অবস্থান। এটা অবশ্য আন্তর্জাতিক সময়ের হিসাবে। গ্রিনিচ মান সময় অনুযায়ী ঘটনাটি ঘটবে ঐ দিনের রাত ১০টা ৪৯ মিনিটে যা আমাদের বাংলাদেশ সময় অনুসারে ৩ তারিখ ভোর ৪ টা।
সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হওয়ায় কিছু সময় আমরা সূর্যের খুবই কাছে থাকি, আবার অন্য সময় থাকি দূরে। উপরোক্ত তারিখে সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর অবস্থানকে অনুসূর (Perihelion) বলা হয়। প্রত্যেকে বছরই জানুয়ারি মাসে পৃথিবী সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকে। অন্য দিকে, জুলাই মাসে অবস্থান হয় সবচেয়ে দূরে। এই অবস্থানটিকে বলা হয় অপসূর (Aphelion)।

জুলাই ও জানুয়ারি মাসে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বের পার্থক্য হয় ৫০ লক্ষ কিলোমিটার। তবু, এই দূরত্ব খুব বেশি নয়। কারণ, এই দূরত্বটুকুও পৃথিবী ঋতু পরিবর্তনের হাতিয়ার নয়। এ কারণেই, জানুয়ারি মাসে আমরা সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকি, তবু এ সময় উত্তর গোলার্ধে শীতকাল থাকে। অন্য দিকে জুলাই মাসে সূর্য দূরে সত্ত্বেও থাকে গরম। আসলে শীত বা গরমের নিয়ামক সূর্য-পৃথিবীর দূরত্ব নয়, বরং পৃথিবীর কক্ষীয় নতি। আমরা জানি পৃথিবী এর আবর্তন অক্ষের সাথে ২৩.৫ ডিগ্রি হেলে আছে। এ জন্যেই উত্তর গোলার্ধে যখন শীত, দক্ষিণ গোলার্ধে তখন গরম। সূর্যের অবস্থানের জন্যে যদি শীত বা গরম হত, তবে একই সাথে পুরো পৃথিবীতে শীত বা গরম অনুভূত হত।
এ বছরের জানুয়ারির ২ তারিখে সূর্য পৃথিবী থেকে ১৪৭, ১০০, ১৭৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অন্য দিকে অপসূর অবস্থানে এই দূরত্ব দাঁড়াবে ১৫২, ১০৩, ৭৭৬ কিলোমিটার। আমরা সাধারণত বলি, সূর্য পৃথিবী থেকে ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সেটা আসলে এই দুই মানের গড় দূরত্ব।


সূত্রঃ
১। আর্থ স্কাই
২। অ্যাস্ট্রোফিক্সেল
Category: articles

Saturday, June 20, 2015

পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব ১৫ কোটি কিলোমিটার। তবে এই দূরত্ব সব সময় একই থাকে না। থাকত যদি পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরতে বৃত্তাকার পথে। কিন্তু সব গ্রহই সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে উপবৃত্তাকার পথে। কেপলারের গ্রহের প্রথম সূত্র অনুসারে।



সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর কক্ষপথের সবচেয়ে কাছের অবস্থানকে বলে অনুসূর। আর সবচেয়ে দূরের অবস্থানের নাম অপসূর। পৃথিবী সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকে জানুয়ারি মাসে। আর সবচেয়ে দূরে থাকে জুলাই মাসে। মজার ব্যাপার হলো, আমরা অনেকেই মনে করি, শীত কালে সূর্য পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে থাকে। অথচ জানুয়ারির তীব্র শীতের সময়ই কিন্তু আমরা সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকি। এই ধারণা ভুল হওয়ার আরও সহজ প্রমাণ হলো, ঐ জানুয়ারি মাসেই কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধে থাকে তীব্র গরম। আসল কথা হলো শীত বা গরম পৃথিবী-সূর্যের দূরত্বের কারণে হয় না। হয় পৃথিবীর কক্ষ তল হেলে থাকার কারণে।

আরও পড়ুন
☛ অনুসূর বনাম অপসূর

অনুসূর অবস্থানে পৃথিবী সূর্য থেকে ১৪.৭ কোটি কিলোমিটার দূরে থাকে। আর জুলাই মাসে অপসূর অবস্থানে এলে এই দূরত্ব বেড়ে হয় ১৫.২ কোটি কিলোমিটার।

পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব 

জ্যোতির্বিদ্যায় পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে। সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ উপগ্রহের দূরত্বের হিসাব করতে কাজে লাগে এ দূরত্বটি। এই দূরত্বের গড়কে বলা হয়
এক অ্যাস্ট্রোনমিকেল ইউনিট (এইউ) । মহাজাগতিক বস্তুর দূরত্বের পরিমাপে আলোকবর্ষের মতো এই এককটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রেই দূরত্ব বলা ও বোঝা দুই ক্ষেত্রেই এইউ একক্টি সুবিধাজনক।

আরও পড়ুন
☛ জ্যোতির্বিদ্যায় দূরত্বের এককেরা

প্লুটো আমাদের থেকে ৫৮৭ কোটি কিলোমিটার দূরে আছে। এটাকে এভাবে বললে আরও সহজ হয়: ৩৯ এইউ। একইভাবে সূর্য থেকে বৃহস্পতি গ্রহের দূরত্ব হয় ৫ দশমিক ২। নেপচুনের দূরত্ব প্রায় ৩০ এইউ। ধূমকেতুর উৎসস্থল বলে অনুমিত সৌরজগতের একেবারে প্রান্তের দিকে অবস্থিত উর্ট মেঘের দূরত্ব সূর্য থেকে ১ লক্ষ এইউ।

অন্য দিকে, সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টৌরির (Proxima centauri) দূরত্ব পৃথিবী থেকে প্রায় আড়াই লাখ এইউ। কিন্তু এই দূরত্বটি এতই বেশি যে একে আলোকবর্ষ এককে মাপাই বেশি সুবিধাজনক। সেই হিসেবে এর দূরত্ব ৪ দশমিক ২ আলোকবর্ষ।

কে মেপেছেন এই দূরত্ব?
খৃষ্টের জন্মের ২৫০ বছর আগেই অ্যারিসটারকাস দূরত্বটি মাপেন। সাম্প্রতিক সময় ১৬৫৩ সালে ক্রিষ্টিয়ান হাইগেনও মাপেন এই দূরত্ব। ১৬৭২ সালে আবার মাপেন গিওভানি ক্যাসিনি। তার পদ্ধতি ছিল লম্বন পদ্ধতি।

সূত্র
১। ইউনিভার্স টুডে: হাউ ফার ইজ আর্থ ফ্রম দ্য সান
২। উইকিপিডিয়া: পেরিহেলিয়ন ও অ্যাপহেলিয়ন
Category: articles

Tuesday, November 4, 2014

এই ঘটনার সাথে আমরা কম বেশি সবাই পরিচিত যে আমরা চলন্ত কোন বস্তুর উপর বসে থাকলে সেটা যদি কোন দিকে মোড় নেয়, আমরা তার উলটো দিকে পড়ে যেতে থাকি, যদি না জিনিসটাকে শক্ত করে ধরে রাখি। কখনও বাসের ছাদে বসেছেন? বসলে টের পেতেন। বাস যখন কোন দিকে মোড় নেয়, আপনাকে শক্ত করে বাসকে ধরে রাখতে হবে, নইলে উলটো দিকে পড়ে আপনার যাত্রা সাঙ্গ হবে। [আমি একবার চড়েছিলাম, কেমন লাগে বোঝার জন্য প্লাস গাড়ি না পেয়ে]
নিচের অ্যানিমেশনে পৃথিবীর আবর্তন দেখুনঃ
পৃথিবী প্রতিনিয়ত পশ্চিম থেকে ঘুরছে। এ জন্যেই ক্রমান্বয়ে রাত- দিন হচ্ছে
আমরা জানি, পশ্চিম থেকে পূবে পৃথিবীর আবর্তন বেগ ঘণ্টায় ১৬৭০ কি.মি (বিষুব অঞ্চলে)।  ঢাকায় এই বেগ ঘণ্টায় ১৫২৯ কি.মি। যাই হোক, এই বিপুল বেগের কারণে আমরা ধরাপৃষ্ঠ থেকে ছিটকে পড়ে যাবার কথা। পৃথিবী আমাদেরকে ফেলে দিয়ে সূর্যকে চক্কর দেবার জন্য প্রতি ঘণ্টায় ১ লাখ আট হাজার কি.মি বেগে ছুটে চলে যেত। এই বেগটা হল সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ বেগ।
কিন্তু, পৃথিবী খুব ভাল! আমাদেরকে ফেলে চলে যায় না। কিন্তু কেন?
কোন বস্তু কোন ঘুর্ণায়মান বস্তুর উপর টিকে থাকবে, নাকি পড়ে যাবে তা নির্ধারণ করে দুটি বিপরীতধর্মী বলের যুদ্ধ। এরা হল বস্তুটির অভিকর্ষ ও কেন্দ্রবিমুখী বল। অনেকে হয়ত মনে করে থাকতে পারেন বলদ্বয় হবে আসলে যথাক্রমে কেন্দ্রমুখী (Centripetal) বল (Force) ও কেন্দ্রবিমুখী বল (Centrifugal Force)। এই বলদ্বয় কিন্তু আসলে একে অপরের সমান ও বিপরীতমুখী, নিউটনের ৩য় সূত্রানুসারে। আর, আমাদের আলোচ্য বলের (Force) যুদ্ধ হবে কিন্তু বড় বস্তুর ক্ষেত্রে যার মহাকর্ষ উল্লেখযোগ্য যেমন, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদি।
এখন তাহলে দেখা যাক পৃথিবীতে কোন বলের আধিপত্য কেমন?
পৃথিবীপৃষ্ঠে অবস্থিত কোন বস্তুকে পৃথিবী F বা W = mg বলে টানে। এখানে F হল আকর্ষণ বল, W হল এই আকর্ষণ তথা অভিকর্ষজনিত বল, টান বা ওজন। m বস্তুর ভর, g হল অভিকর্ষজ ত্বরণ , যার কারণে প্রতি সেকেন্ডে যে বেগ বৃদ্ধি পায়। g এর মান হল প্রতি বর্গ সেকেন্ডে মোটামুটি ৯.৮ মিটার।
যাই হোক, এই সূত্র আপাতত আমাদের খুব বেশি দরকার নেই। আমাদের এতটুকু জানলেই চলবে যে পৃথিবীর অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) প্রতি বর্গ সেকেন্ডে মোটামুটি ৯.৮ মিটার। ।
এখন, আমাদের জানা দরকার আবর্তনের জন্য আমাদের বেগ কী পরিমান হ্রাস পায়।
আমরা জানি,  ঘূর্ণায়মান বা আবর্তনশীল কোন বস্তুর ত্বরণ (Acceleration) বের করার  সূত্র হল,
ঘূর্ণনশীল বস্তুর ত্বরণ বের করার সূত্র

পৃথিবীর ঘূর্ণন বা আবর্তন বেগ হল,  v =  ৪৬৪ মি/সেকেন্ড, ব্যাসার্ধ,  r = ৬৩৭১ কিমি.
বা ৬, ৩৭১, ০০০ মিটার।
হিসেব করে পাই, ত্বরণ a = প্রায় ০.০৩৮৮ মিটার (প্রতি বর্গ সেকেন্ডে)।
অর্থ্যাৎ পৃথিবীর আবর্তনের কারণে আমরা প্রতি বর্গ সেকেন্ডে মাত্র ০.০৩৩৮ মিটার হারে পড়ে যেতে থাকি, যেখানে অভিকর্ষ আমাদেরকে তার প্রায় ২৯০ গুণ ত্বরণে (৯.৮১ মিটার/বর্গ সেকেন্ড) টেনে ধরে রাখে।
তাহলে কিভাবে আমরা কোন দিকে পড়ে যাব?
অর্থ্যাৎ পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে আমরা যে বলে পড়ে যাবার উপক্রম হই, তার চেয়ে অনেক বেশি বলে পৃথিবী আমাদেরকে টেনে ধরে রাখে। এ জন্যেই আমরা পড়ে যাই না।
উপরন্তু, উপরের এই হিসাব শুধু বিষুব অঞ্চলের জন্য। আমাদের বাংলাদেশে কেন্দ্রবিমুখী বলের প্রভাব হবে আরও কম। এটি নির্ভর করবে কোনো অঞ্চল বিষুব রেখা থেকে কত দূরে আছে তার উপর। আবর্তন বেগ জেনে নিয়ে আপনিও বের করতে পারেন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্যে এই প্রভাব কতটুকু। 
Category: articles
এক কথায় বললে বলতে হয়, পৃথিবীর আবর্তন বেগ ঘণ্টায় ১৬৭০ কিলোমিটার বা সেকেন্ডে প্রায় ৪৬৪ মিটার। তবে এই মান সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিস্তারিত জেনে নিই, চলুন।
পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ঘুরছে
পৃথিবী প্রতিনিয়ত পশ্চিম থেকে পূবে আবর্তন করে চলছে। এই আবর্তনের কারণেই ক্রমান্বয়ে রাত দিন হয়, সুর্যোদয় ও সূর্যাস্ত ঘটে। পশ্চিম থেকে পূবে এই আবর্তনের জন্যেই উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তে দুটি মেরুর উদ্ভব ঘটেছে।
আরও পড়ুনঃ  পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণে মেরু থাকলেও পূবে পশ্চিমে মেরু নেই কেন

পৃথিবীর আবর্তন বেগ কিন্তু সর্বত্র সমান নয়। বিষুব অঞ্চল তথা দুই মেরুর ঠিক মাঝখানে এই বেগ সর্বোচ্চ। অন্য দিকে,  বিষুব অঞ্চল থেকে মেরুর দিকে নিকটবর্তী হতে থাকলে বেগ কমতে থাকে। ঠিক মেরুবিন্দুতে বেগ শুন্য। এটা বোঝার জন্যে উপর্যুক্ত লিঙ্কে একটি উদাহরণ দিয়েছিলাম। এখন ভিন্ন একটি দিচ্ছি।
মনে করুন, আপনি একটি সুতার প্রান্তবিন্দুতে একটি বল বেঁধে সুতাসহ বলটিকে চারপাশে ঘোরাচ্ছেন। তাহলে দেখবেন, সুতার একেবারে প্রান্তবিন্দুতে বেগ সর্বোচ্চ। সুতার কোন বিন্দু আপনার হাতের যত নিকটে হবে তত বেগ হবে কম। ঐ ঘূর্ণন পথের কেন্দ্রবিন্দুতে বেগ হবে জিরো। কারণ সেটি ঘুরছেই না।
কল্পনায় পৃথিবীকে একবার পশ্চিম থেকে পূবে চক্কর দেওয়ান। অথবা একটি টেনিস বল বা কমলা হাতে নিয়ে একইভাবে ঘোরান। দেখবেন প্রান্তবিন্দুর দিকে ক্রমান্বয়ে বেগ কম এবং একেবারে মেরুতে জিরো।
অবশ্য, এখানে আমরা রৈখিক বেগের কথা বলেছি। ঘূর্ণায়মান বস্তুর জন্যে আরেকটি বেগ হল কৌণিক বেগ। সেটি কিন্তু প্রতিটি বিন্দুতে একই হবে। কারণ, প্রতিটি বিন্দুই সমান সময়ে সমান পথ তথা ৩৬০ ডিগ্রি অতিক্রম করবে।

এখন, আসুন নিজেরাই বের করে ফেলি পৃথিবীর আবর্তন বেগ কত।
আমরা জানি সমবেগের জন্য সূত্র হল S = vt।
এখানে, S = অতিক্রান্ত দূরত্ব,
           v= বেগ এবং
           t= সময়
তাহলে পাই, বেগের সূত্র হবে,
বেগ বের করতে হলে আমাদের অতিক্রান্ত দূরত্ব (S) ও এই দূরত্ব পাড়ি দিতে অতিবাহিত সময় (t) জানতে হবে।
আমরা জানি, পৃথিবী প্রায় ২৪ ঘন্টায় একবার আবর্তন সম্পন্ন করে। আর বিষুব রেখা বরাবর এর পরিধি হল ৪০, ০৭৫ কিমি.। এই পথই আমরা (আসলে আমরা না, যারা বিষুব অঞ্চলে বাস করে) পৃথিবীর বুকে বসে পাড়ি দেই ২৪ ঘণ্টায়।
তাহলে, বিষুব অঞ্চলে আবর্তন বেগ = (৪০০৭৫ ÷২৪) কিমি./ঘণ্টা। 
অর্থ্যাৎ ঘন্টায় প্রায় ১৬৭০ কি.মি। মাইলের হিসাবে এই বেগ হল ঘণ্টায় ১০৭০। এসআই এককে হিসেব করলে হবে সেকেন্ডে প্রায় ৪৬৪ মিটার। 

এই বেগ কিন্তু বিষুব অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য। বিষুব অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে যেতে থাকলে পৃথিবীর আবর্তন অক্ষের দূরত্ব কাছে চলে আসবে। ফলে, ঐ বিন্দুর সাপেক্ষে পরিধি তথা ২৪ ঘণ্টায় অতিক্রান্ত পথ আরো কম হবে। [উপরের চিত্রটি দেখুন]
বিষুব অঞ্চল ছাড়া অন্য অঞ্চলে বেগ বের করার জন্য আমাদেরকে মূল বেগের সাথে ঐ স্থানের অক্ষাংশের cos এর মান গুণ করতে হবে। 
তাহলে, ৪৫ ডিগ্রি অক্ষাংশে পৃথিবীর আবর্তন বেগ হবে 
v = 1670 × cos 45 km/h 
= 1670 × 0.707 
= 1180 km/h। 
অর্থ্যাৎ ঘণ্টায় ১১৮০ কিলোমিটার বা সেকেন্ডে প্রায় ৩২৮ মিটার। 

আমাদের ঢাকায় পৃথিবীর আবর্তব বেগ কত হবে?
ঢাকার অক্ষাংশ হল 23.7 ডিগ্রি উত্তর। 
তাহলে, বেগ, v = 1670 ×  (cos 23.7) = 1529 km/h  
অর্থ্যাৎ, ঘণ্টায় ১৫২৯ কিমি. বা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৪২৪ মিটার। 
এত বিশাল বেগে ঘুরছি আমরা! তাহলে পৃথিবী থেকে পড়ে যাচ্ছি না কেন
জানতে হলে এই নিবন্ধটি পড়ুন। 

সূত্রঃ
১. উইকিপিডিয়াঃ Earth
২. নাসা

Category: articles

Saturday, June 28, 2014

পৃথিবী প্রতি ঘন্টায় ১৬৭০ কি.মি. বেগে ( সেকেন্ডে ৪৬৫ মি. বা ১০৭০ মাইল /ঘণ্টা) নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরছে। এই ঘুর্নণের দিক হচ্ছে পশ্চিম থেকে পূবে।  আর এই ঘূর্নণের দিকই নির্ধারণ করেছে কোন দিক মেরু হবে। এই যে ঘুর্ণন বেগ -এটি কার্যকর শুধুমাত্র বিষুব অঞ্চলের জন্য, যা দুই মেরুর ঠিক মাঝে অবস্থিত। বিষুব অঞ্চল থেকে যতই মেরুর দিকে যাওয়া হবে ততই এই বেগ হ্রাস পেতে থাকবে।

আরও পড়ুন
☛ মেরু ও বিষুব অঞ্চলের পরিচয়

বিষুব রেখা থেকে মেরুর দিকে গেলে ঘূর্নণের হ্রাসপ্রাপ্ত মান বের করতে হলে স্বাভাবিক মানের সাথে অক্ষাংশের cos এর মান গুণ করতে হবে।

পৃথিবীর দুই মেরুর ঠিক মাঝে অবস্থিত বিষুব অঞ্চল 

যেমন, ৪৫ ডিগ্রি অক্ষাংশে এই বেগ হবে 1670 *Cos 45 Km/h= 1670*.707 = 1180 Km/h।
এই মান কমতে কমতে মেরুতে গিয়ে হয় জিরো। কারণ মেরুতে অক্ষাংশ হল ৯০ ডিগ্রি।  Cos 90 = 0 বলে গুনফল হয় জিরো।

এটাতো গাণিতিক মত। তবে গণিত কখোনই অসত্য কথা বলে না। মেরুতে বেগ কেন জিরো এটা একটি উদাহরণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, আমরা টপিকের মধ্যেই আছি। একটু পর বোঝা যাবে।

গ্রামে আগেকার দিকে মাঠের মাঝখানে একটি খুঁটি গেঁড়ে খুঁটির সাথে গরুকে বেঁধে খুঁটির চারপাশে চক্রাকারে ঘোরানো হত। এতে করে ধান গাছে অল্প যে কিছু ধান থেকে যেত তা গরুর পায়ের চাপে ঝরে পড়ে নিচে জমা হত। আমরা যদি একটু চিন্তা করি,  রশির একেবার প্রান্ত বিন্দুতে ঘূর্নণ বেগ সর্বোচ্চ। খুঁটির দিকে কাছাকাছি হলে ক্রমেই বেগ কমতে থাকবে। কারণ, যে সময়ে বাইরের প্রান্ত বিন্দু এক চক্কর দেবে সেই সময়েই ভেতরের যে কোন বিন্দুও এক চক্কর দিয়ে দেবে। কিন্তু ভেতরের যে কোন বিন্দু চক্কর দিতে অনেক কম পথ যেতে হবে। সময় একই লাগায় ভেতরের বিন্দুর বেগ কম হতে হবে।

কল্পনায় এবার পৃথিবীকে একবার পশ্চিম থেকে পূবে চক্কর দেওয়ান। অথবা একটি আপেল/ কমলা হাতে নিয়ে একইভাবে ঘোরান। দেখবেন প্রান্তবিন্দুর দিকে ক্রমান্বয়ে বেগ কম এবং একেবারে মেরুতে জিরো।

এবার মূল আলচনায় ফিরে আসি। আসলে এই ঘূর্ণনের সাথেই মেরুর ব্যাপার জড়িত।
পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূবে আবর্তন করায় এর দুই আবর্তন অক্ষ উত্তরে ও দক্ষিণে অবস্থিত। আসলে এই অক্ষটি হচ্ছে কেন্দ্র দিয়ে দুই মেরুর সংযোজক সরলরেখা। দুই মেরু বিন্দু পৃথিবীর আবর্তন অক্ষের দুই প্রান্ত বিন্দু। ফলে এই বিন্দু দুইটি আসলে বিশেষ দুটি বিন্দু, যেমন বিশেষ বিন্দু আর কোথাও নেই।

পৃথিবী যদি উত্তর থেকে দক্ষিণে বা দক্ষিণ থেকে উত্তরে আবর্তন করত তবে পূবে ও পশ্চিমে এই রকম বিশেষ দুটি সৃষ্টি হত।

আবার, উত্তর ও দক্ষিণ মেরু যথাক্রমে পৃথিবীর সর্ব উত্তর ও সর্ব দক্ষিণের বিন্দু। বিন্দুগুলো প্রকৃত/আক্ষরিক অর্থেই প্রান্তিক। কিন্তু একটু চিন্তা করুন পূর্ব বা পশ্চিমে কি এমন কোন প্রান্তিক অবস্থান আছে যাকে আমরা সবচেয়ে পূর্ব/ পশ্চিম বলবো?


ম্যাপে আমরা যেটাকে পূর্ব / পশ্চিম বলি সেটা শুধুই আপেক্ষিক। বেশিরভাগ ম্যাপেই আমেরিকাকে পশ্চিমে ও ওশোনিয়াকে পূর্বে দেখানো হয়। তাই বলে বলা যাবে না যে আমেরিকাই সবচেয়ে পূর্বের জায়গা।

পৃথিবীর ম্যাপকে একটু ভিন্নভাবে দেখানো হল। তাহলে আমেরিকা আসলে আমাদের থেকে পূর্ব দিকে নাকি পশ্চিম দিকে? 
ইলাস্ট্রেটেড অক্সফোর্ড ডিকশনারির পেছনে একটি ওয়ার্ল্ড ম্যাপ আছে। তাতে আমেরিকাকে দেখানো হয়েছে রাশিয়ার ডানে - মানে পূবে- একেবারে পৃষ্টার ডান পাশে। দেখানো যেতেই পারে।  তার মানে এই নয় যে আমেরিকাই এখন পূবে চলে গেছে। ঐ ম্যাপে আফ্রিকা ও ইউরোপ একেবারে বাঁয়ে- মানে পশ্চিমে। কিন্তু কোনটাই পরম পশ্চিম বা পরম পূর্ব নয়।

ধরুন, আপনি পূর্ব-পশ্চিমের কোন অবস্থান থেকে (মানে কোন একটি দ্রাঘিমাংশ বিন্দু থেকে) (ধরুন) পূবে যাচ্ছেন। যতই পূবে যান না কেন পশ্চিম সব সময় আপনার পেছনেই থাকবে।

যেমন আপনি বাংলাদেশ থেকে পূবে যেতে থাকলে ক্রমে মায়ানমার, চীন, তাইওয়ান, জাপান, প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে আমেরিকায় পৌঁছে যাবেন। আরো যেতে থাকলে মেক্সিকো, কিউবা, মরক্কো,  আলজেরিয়া, মধ্য প্রাচ্য, পাকিস্তান, ভারত হয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসবেন। নাক বরাবর যদি হাঁটতে থাকেন, সব সময়ই কিন্তু আপনার পেছনে পশ্চিম থাকবে।

কিন্তু এবার আপনি যদি বলেন, না, পূর্ব-পশ্চিমে পরিধি পাড়ি না দিয়ে আমি উত্তর-দক্ষিণ বরাবর পাড়ি দেব। এই অভিযানে স্বাগতম। এবারে আপনি উত্তর দিকে যাত্রা করলেন। তাহলে ভারত, ভুটান, চীন, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়া পাড়ি দিয়ে আপনি চলে যাবেন সুমেরুতে, মানে উত্তর মেরুতে।
ধরুন ঠিক এই মুহূর্তে আপনি সুমেরু (উত্তর মেরু) থেকে আরেক পা বাড়ালেন (এত পথ আপনাকে হাঁটিয়েই নিচ্ছি)। একটু আগে আপনার পেছনে ছিলো দক্ষিণ। এবার? পেছনে উত্তর আর সামনে দক্ষিণ।

হায়! হায়! আপনিতো ঘোরেননি, কিন্তু দিক যে পাল্টে গেলো!
যাক, কিছু মনে না করে আপনি যখন আরো এগিয়ে আমেরিকা মহাদেশের উপর দিয়ে চলে বাংলাদেশের প্রতিপাদ স্থান চিলি পার হয়ে দক্ষিণ মেরু ক্রস করলেন, আরেকটি ধাক্কা! সামনে এতক্ষণ দক্ষিণ ছিল, তা আবার ঘুরে উত্তর হয়ে গেলো।

এটাই হলো উত্তর ও দক্ষিণ বিন্দুর বিশেষত্ব। কিন্তু পূর্ব বা পশ্চিমের কোন বিন্দুর এমন কোন বিশেষত্ব নেই, কোন প্রান্তিক বিন্দু নেই, তাই মেরুও নেই।

সূত্রঃ
১। image.gsfc.nasa.gov/poetry/ask/a10840.html
Category: articles