Advertisement

Saturday, March 4, 2017

এর আগে একটি নিবন্ধে আমরা দেখেছিলাম, মহাকর্ষ কীভাবে কাল দীর্ঘায়ন ঘটায়। আজ এর গাণিতিক হিসাব দেখব আমরা।

মহাকর্ষীয় কাল দীর্ঘায়ন (Gravitational time dilation) অনুসারে, মহাকর্ষীয় বিভবের মান যেখানে বেশি, সে অঞ্চলের সময় তুলনামূলক আস্তে চলবে। অর্থ্যাৎ, মহাকর্ষের উৎসের তুলনামূলক কাছে সময় ধীরে চলে। যেমন, আপনি ভূপৃষ্ঠের যত কাছে থাকবেন,  পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা যে কারও চেয়ে আপনার সময় তত ধীরে অতিবাহিত হবে।


এ ফলাফলগুলো পাওয়া যায় আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity) থেকে। এ তত্ত্বের সমীকরণগুলো অতিমাত্রায় জটিল ও সাধারণের জন্যে দূর্বোধ্য। তবে, কাল দীর্ঘায়নের সমীকরণ সে তুলনায় অনেক সরল। বেগ জনিত কাল দীর্ঘায়নের সূত্রের সাথেও এর বেশ মিল আছে।

মহাকর্ষীয় কাল দীর্ঘায়ন এর সূত্র

এখানে to হচ্ছে কোনো ঘটনার প্রকৃত সময় (Proper time)। দর্শক এবং ঘটনা একই মহাকর্ষীয় বিভবে অবস্থান করলে পরিমাপে এ সময় দেখা যাবে। আর tহচ্ছে যে-কোনো ভর থেকে অসীম দূরত্বে অবস্থান করে মাপা সময়। অর্থ্যাৎ, আমরা ধরে নিচ্ছি tf পরিমাপের জায়গায় আলোচ্য ভরের মহাকর্ষীয় প্রভাব নগণ্য।

G হলো নিউটনের সার্বজনীন মহাকর্ষীয় ধ্রুবক। c হলো শূন্যস্থানে আলোর বেগ।  M হচ্ছে আলোচ্য বস্তুর ভর। আর r হলো বস্তুটা থেকে (মানে এর মহাকর্ষীয় কেন্দ্র থেকে) ঘটনার দূরত্ব।

সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের একটি সূত্র বের হয় সোয়ার্জসাইল্ড সমাধান থেকে। এটাই ব্ল্যাক হোলের সমীকরণ। সূত্র থেকে আপনি পাবেন সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের মান।  M ভরের একটি বস্তুর সবটুকু ভর এ ব্যাসার্ধের ভেতরে অবস্থান করলে বস্তুটির মহাকর্ষ এত শক্তিশালী হবে যে, এর থেকে কোনো কিছুই বেরিয়ে আসতে পারবে না। এমনকি আলোও না।

আরও পড়ুনঃ 
☛ আলো কীভাবে ব্ল্যাক হোলে আটকা পড়ে?

সূত্রটি হলোঃ
সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের সমীকরণ


এখানে rs-ই হলো সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধ।
ব্ল্যাক হোলের সীমানায় পৌঁছে সূত্রটি প্রয়োগ করলে আমরা পাই r = rs। ফলে to এর মান হয়ে যাবে শূন্য। তার মানে, বাইরের কোনো দর্শকের কাছে মনে হবে এখানে সময় থেমে আছে। ফলে ব্ল্যাক হোলের সীমানা পেরিয়ে কোনো কিছুকে কখনোই ভেতরে যেতে দেখা যাবে না।

তবে ব্ল্যাক হোলে পড়েই গেলে ব্যাপারটা হয়ে পড়ে আরও উদ্ভট। অবশ্য বাইরে থেকে এ পতন দেখা সম্ভব হবে না। যাই হোক, এক্ষেত্রে বর্গমূলের ভেতরের রাশিটা হবে ঋণাত্মক। মানে, ফল হিসেবে পাওয়া যাবে কাল্পনিক সময়, যার ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত জানা নেই।

সূত্রঃ
১। সাসেক্স ওয়েবসাইট 
Category: articles

Saturday, August 20, 2016

আজকে আমরা দেখবো ব্ল্যাকহোল ভ্রমণ করতে গেলে আমাদের ভাগ্যে কী হবে? আমরা চাঁদে যেতে পারি, মঙ্গলে যেতে পারি। হয়ত কোন দিন সৌরজগৎ পেরিয়ে কোন ভিনগ্রহেও পাড়ি জমাতে পারি। আমরা না গেলেও নাসার মহাকাশযান ভয়েজার ১ এবং ২ তো ইতোমধ্যেই সৌরজগৎ পেরিয়ে আন্তঃনাক্ষত্রিক জগতে বিচরণ করছে। এটা হতে পারে আমাদের দূর মহাকাশে যাবার একটি নিশানা।

আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি, সূর্যের চেয়ে অনেক বিশাল- সাধারণত সুপারজায়ান্ট জাতীয় নক্ষত্রদের ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের মাধ্যমে বহিরাবরণ ছুঁড়ে ফেলার পর বাকী অংশ গুটিয়ে গিয়ে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়। আর ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে তৈরি হয় সিঙ্গুলারিটি। এটি হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে অবস্থিত অতিশয় ক্ষুদ্র একটি বিন্দু।  এর দিকে আমরা যতই এগোবো, ততই মহাকর্ষের শক্তি বৃদ্ধি পেয়ে অসীমের দিকে যেতে থাকবে এবং স্থান-কালের (Space-time) বক্রতাও ক্রমশ অসীমের দিকে ছুটবে। আর, ঠিক সিঙ্গুলারিটিতে স্থান-কাল আমাদের পরিচিত উপায়ে আর কাজ করবে না। তাহলে আমরা এতে গেলে কী ঘটবে?
একটি সরল ব্ল্যাক হোল নিয়ে চিন্তা করা যাক। ধরলাম, বিপুল পরিমাণ ভর থাকলেও এর কোন বৈদ্যুতিক আধান (Electric charge) বা ঘূর্ণন প্রবণতা নেই।
ব্ল্যাক হোলের বিভিন্ন অঞ্চল

ছবিতে ব্ল্যাক হোলের বিভিন্ন স্তর দেখা যাচ্ছে। সবুজ রঙ চিহ্নিত অঞ্চলটি হচ্ছে নিরাপদ অঞ্চল। এখানে আমাদের মহাকাশযান নিরাপদে এবং ভারসাম্য বজায় রেখে কক্ষপথে অবস্থান করতে পারবো। চাইলে আমরা ফিরেও আসতে পারবো।  হলুদ অঞ্চলটি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে একটু গড়বড় হয়ে গেলেই আমরা ব্ল্যাক হোলের শিকার হয়ে যেতে পারি। তাই, এখানে মহাকাশযানে পাইলটকে অতিমাত্রায় দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। সেক্ষেত্রে, এখানেও মহাকাশযানের জন্যে একটি কক্ষপথের ব্যাবস্থা করা সম্ভব যদিও সেটা হবে অস্থিতিশীল (Unstable)।
কমলা রঙের অঞ্চল বিপদ সঙ্কেত প্রদান করছে। এখানে স্থিতিশীল বা অস্থিতিশীল- কোন রকম কক্ষপথই পাওয়া যাবে না। এখানে অবস্থান ধরে রাখতে হলে আমাদেরকে অবিরত জ্বালানী খরচ করে ব্ল্যাক হোলের বাইরের দিকে যানের ধাক্কা বজায় রাখতে হবে। এ অঞ্চলে আমরা যতই ভেতরের দিকে যাবো, ততোই রকেটের পরিশ্রম বাড়াতে হবে। লাল অঞ্চল ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত (Event horizon)। এখান থেকে ফিরে আসার কোন উপায় নেই।
ব্ল্যাক হোলের দিকে যাত্রা

উপরের ছবিতে একটি ঘড়ি দেখা যাচ্ছে। আমাদের সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছার সময় মাপছে ঘড়িখানা- আমাদের প্রচলিত সময়ের হিসাব অনুযায়ী। কিন্তু আমরা যতই ভেতরে যাবো, সময় ধীরে চলার কারণে ঘড়ির কাঁটার গতি কমে যাবে।
এখন ধরা যাক এবার আমরা সবুজ অঞ্চল থেকে ভেতরে পা বাড়ালাম। সাথে সাথে আমাদের চোখে পড়বে ব্ল্যাক হোল বাইরের নক্ষত্রের আলোকে এর সীমানায় এনে বৃত্তাকার কক্ষপথে স্থান দিয়েছে। এটা আসলে গ্র্যাভেটেশনাল লেন্সিং এর প্রতিক্রিয়া।  ব্ল্যাক হোল স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলায় আমরা একই সাথে এর সম্মুখ ও পশ্চাৎ দিক দেখতে পাবো। যেমন, ছবিতে ব্ল্যাক হোলের উত্তর ও দক্ষিণ মেরু একই সাথে দেখা যাচ্ছে। লাল ফেব্রিক চিহ্নিত এই অঞ্চলই ব্ল্যাক হোলের সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধ।
সোয়ার্জাসাইল্ড ব্যাসার্ধই হল ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের সীমানা, যার ভেতর থেকে কোনো কিছু বের হতে পারে না, কোন কিছু দেখা যায় না।
আরো পড়ুনঃ 
গ্র্যাভেটেশনাল লেন্সিং কীভাবে ঘটে?
ব্ল্যাক হোল কত বড়ো হয়? (এখানে সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে)

৩ সোয়ার্জসাইল্ড দূরত্বে আমাদের কক্ষপথ সম্পূর্ণ নিরাপদ। এখানে যতক্ষণ আছি- আমরা নিরাপদ। চাইলে আবার ফিরে আসতে পারবো। যখন এটা পাড়ি দিয়ে ২ সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধে পৌঁছবো, এবার অবস্থান হয়ে যাবে ভারসাম্যহীন। এখানে যানের জ্বালানি খরচে একটু এদিক-ওদিক হয়ে গেলেই আমার হয় সোজা ব্ল্যাক হোলের দিকে চলে যাবো অথবা উল্টোদিকে- বাইরের দুনিয়ায় ধেয়ে আসবো।


এই অঞ্চলেই ফোটন স্ফিয়ার তথা আলোকমণ্ডলের (Photon sphere) অবস্থান। এখানে স্বয়ং আলো অবিরত কক্ষপথে ঘুরপাক খেতে থাকে। এটাই ছিল আমাদের প্রথম পর্বের প্রশ্ন। আশা করি, উত্তর পেয়ে গেছেন। এটাই ব্ল্যাক হোলের নিকটতম দূরত্ব যেখানে কোনো কিছু কক্ষপথ পেতে পারে। আমরা যদি এখানে (ফোটন স্ফিয়ারে) আমাদের যানকে ধরে রাখতে চাই তাহলে অসীম জ্বালানি খরচ করতে হবে।
এবার আমরা প্রবেশ করবো ১ সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধ পাড়ি দিয়ে দিগন্তের দিকে।



এখানেই ঘটবে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। লাল ঘটনা দিগন্ত দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যাবে- দিগন্ত এবং প্রতি দিগন্ত (Horizon, anti-horizon)। আমরা দিগন্ত ভেদ করলে আসল দিগন্ত আমাদের চোখে দৃশ্যমান হবে। অন্য দিকে, প্রতি-দিগন্ত আমাদের সামনেই থেকে যাবে। একে আমরা কখোনই অতিক্রম করে যেতে পারবো না। আচ্ছা, ব্ল্যাক হোলের ভেতরে চলে গেলে কি আমরা অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যাবো? এটা ভুল ধারণা। আমরা যতই ভেতরে যাবো, বাইরের বিশ্ব ততোই উজ্জ্বল মনে হবে।

ব্ল্যাক হোলের ভেতরে অন্ধকার নয়, বরং অনেক অনেক আলোকিত দেখাবে

এরপর আমরা আরো ভেতরে গেলাম। কী হবে- একটু পর বলছি। কিন্তু আমরা কখোনই সিঙ্গুলারিটিত দেখতে পারবো না। কেননা, কোন আলোই এর থেকে বাইরের দিকে আসতে পারে না। সব চলে যায় এর পেটের ভেতর।

আমরা কখোনই আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্য তথা সিঙ্গুলারিটিতে পৌঁছবো না। কেন? আচ্ছা, বিস্তারিত বলছি।
মনে করুন আপনি নভোযানে চড়ে একে আমাদের মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে অবস্থিত ব্ল্যাক হোলটির দিকে চালিয়ে দিলেন। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছলেন ব্ল্যাক হোলের তীরে । এবার যান বন্ধ করে দিলেন। কী ঘটবে?
প্রথমে এর মহাকর্ষ একেবারেই অনুভব করবেন না। যেহেতু আপনি মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তুর মত করে বিনা বাধায় পড়ছেন, আপনার দেহের প্রত্যেকটি অংশ এবং তোমার নভোযান- সব কিছুই একইভাবে ব্ল্যাক হোলের দিকে ধাবিত হবে। অনুভব হবে ওজোনহীনতা। পৃথিবীর চারদিকে কৃত্রিম উপগ্রহে বসবাসরত নভোচারীদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। যদিও পৃথিবীর অভিকর্ষ নভোচারী এবং স্পেইস শাটল- দুটোকেই টানছে, তবু এরা কোন অভিকর্ষ বল অনুভব করে না, কারণ সব কিছু ঠিক একইভাবে টান অনুভব করছে।
ব্ল্যাক হোলের যতই কাছাকাছি হবেন, আস্তে আস্তে এর মহাকর্ষজনিত শক্তিমত্তা অনুভূত হতে থাকবে। মনে করুন, আপনার পা আপনার মাথার চেয়ে ব্ল্যাকহোলের নিকটবর্তী। ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্র থেকে কোন বস্তু যত বেশি কাছে থাকবে, তার উপর এর আকর্ষণও তত প্রকট হবে। এবার ভাবুন, আপনার পা কিন্তু মাথার চেয়ে দানবের মুখের বেশি কাছে। ফলে, ব্ল্যাক হোল আপনাকে টেনে লম্বা বানিয়ে দেবে।
ব্ল্যাক হোলের কাছে গেলে মাথা ও পায়ের প্রতি মহাকর্ষীয় আকর্ষের তারতম্যের কারণে এক অংশ লমাব হয়ে এমন সেমাইয়ের মতো হয়ে যাবে। 
যতই কাছে যাবেন, পা ও মাথার প্রতি ব্ল্যাক হোলের অসম আকর্ষণের মাত্রা বাড়তেই থাকবে।
কেমন হবে, যদি আপনার পায়ের দৈর্ঘ্য হয়ে যায় ১০ ফুট বা ১০০ ফুট। আরো মারাত্মক কথা হলো, পাতো শুধু লম্বাই হবে না, এক সময় দেহ থেকে আলাদাই হয়ে যাবে। ভয় লাগছে?
তবে, উপরোক্ত বিপদ কাটানোর একটি উপায় আছে বটে! বলছি পরে। আপনার ব্ল্যাক হোল অভিযানের স্বপ্নের কিন্তু সমাপ্তি ঘটে যায়নি। হতাশ হবেন না!

আপনি যদি অভিযানের জন্যে একটি বড় ব্ল্যাক হোল বেছে নেন, তাহলে এর কেন্দ্র থেকে ৬ লক্ষ কিলোমিটার দূরত্বের না যাওয়া পর্যন্ত লক্ষ্যণীয় প্রভাব অনুভূত হবে না। এটা হলো এর ঘটনা দিগন্তের সীমানা। কিন্তু আপনি যদি একটি ছোট, মনে করুন সূর্যের কাছাকাছি ভরের, একটি ব্ল্যাক হোল বাছাই করেন, তাহলে আপনি এর কেন্দ্রের ৬ হাজার কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছতেই কাছে অসহনীয় অবস্থা অনুভূত হবে। এই ক্ষেত্রে, ঘটনা দিগন্তে পৌঁছার আগেই আপনি টুকরো টুকরো হয়ে যাবেন। এই জন্যেই ব্ল্যাক হোল অভিযানে যেতে চাইলে বড়োসড়ো কোন ব্ল্যাক হোল বাছাই করাই নিরাপদ। ভেতরে গিয়ে অন্তত পৌঁছতে না পারলেতো অভিযান শুরুই হলো না!

ব্ল্যাক হোলে পতনের সময় আপনি কী দেখবেন?
মজার ব্যাপার হলো, আপনি যে বিশেষ মজার কিছু দেখে ফেলবেন- এমন কিন্তু না। আপনি যদি দূরের কোন দৃশ্য দেখতে যান, তবেই লাগবে বেখাপ্পা। বস্তুর চেহারা বিকৃত দেখাবে, কারণ ব্ল্যাক হোল এর অভিকর্ষের প্রভাবে আলোকে বাঁকিয়ে এনে আপনার চোখে ফেলবে। কাঁচের পানির গ্লাসের ভেতর দিয়ে কখনো বিপরীত দিকে তাকিয়েছেন নিশ্চয়ই? কেমন দেখায়? এবড়োথেবড়ো বিম্ব, তাই না? একই প্রভাব পরিলক্ষিত হবে এখানেও। কিন্তু ঐটুকুই। ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করার সময় আর বিশেষ কিছু ঘটবে না।
ঘটনা দিগন্ত ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করার পরেও আপনি বাইরের দৃশ্য দেখতে পাবেন। কারণ, তখনো বাইরের আলো আপনার কাছে পৌঁছতে পারবে। তবে, এখন বাইরের কেউ আপনাকে দেখতে পাবে না। কারণ, আপনার দেহ থেকে আসা আলো ঘটনা দিগন্তকে ভেদ করতে পারছে না।

এই সব কিছু ঘটতে কতক্ষণ লাগবে? ব্যাপারটা নির্ভর করে আপনার যাত্রা শুরুর অবস্থানের ওপর। মনে করুন, আপনি এমন জায়গা থেকে যাত্রা শুরু করলেন, যা ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রবিন্দু থেকে এর সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের ১০ গুণ দূরে অবস্থিত। তাহলে, প্রায় ১০ লাখ সৌর ভরের সমান ভরযুক্ত ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত অতিক্রম করতে আপনার সময় লাগবে প্রায় ৮ মিনিট। এই সীমানা পার হবার পরে, কেন্দ্রে পৌঁছতে আপনার আর মাত্র ৭ সেকেন্ড সময় লাগবে। ব্ল্যাক হোলের আকার বড়ো- ছোট হবার সাথে সাথে এই সময়ও কম বেশি হবে।
ঘটনা দিগন্ত পার হবার পরবর্তী ৭ সেকেন্ডে আপনার ভয় লাগা শুরু হতে পারে। আপনি হয়তো ভয় পেয়ে আপনার নভোযানকে পেছনে ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা চালাবে, যাতে কেন্দ্রে যেতে না হয়। কিন্তু হায়! বৃথা চেষ্টা। কেন্দ্রে পৌঁছা ছাড়া যে উপায় নেই। কী আর করা, এই শেষ সময়টুকু উপভোগ করে নেওয়াই ভালো।
এতো গেল আপনার কথা। মনে করুন, আপনার এক প্রিয় বন্ধু (নাম দিলাম জায়েদ) আপানকে বিদায় জানাবার জন্যে ঘটনা দিগন্তের ওপারে অপেক্ষা করছিল। ও কী দেখবে? আসলে, ও আপনার চেয়ে সম্পুর্ণ ভিন্ন দৃশ্য দেখবে। আপনি দিগন্তের যত কাছাকাছি হবেন, ততই ওর কাছে মনে হবে, আপনার গতিবেগ কমে যাচ্ছে। ও যদি কেয়ামত পর্যন্তও অপেক্ষা করতে থাকে, তবু আপনাকে কোনো দিনই ঘটনা দিগন্ত পাড়ি দিতে দেখবে না ।
সত্যি বলতে, প্রথমে ব্ল্যাক হোল যে পদার্থ দিয়ে গঠিত হয়েছিল তার সম্পর্কে কম বেশি- একই কথা বলা চলে। একটি সংকোচনশীল (Collapsing) নক্ষত্র থেকে সৃষ্ট ব্ল্যাক হোলের কথা ধরা যাক। ব্ল্যাক হোল গঠিত হবার জন্যে যখন এর উপাদানগুলো সঙ্কুচিত হতে থাকবে, জায়েদ একে ক্রমেই ছোট হয়ে যেতে দেখবে। ওর চোখে এর ব্যাসার্ধ আস্তে আস্তে স্কোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের নিকটবর্তী হতে থাকবে, কিন্তু কখনো এর সমান হবে না। এই কারণেই আগে ব্ল্যাক হোলকে হিমায়িত নক্ষত্র (Frozen star) বলা হতো। কারণ, এরা স্কোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধের কিছুটা বড়ো ব্যাসার্ধ্যে এসে জমে যায়।
ও এমন দেখবে কেন? আসলে এটা একটি আলোকীয় দৃষ্টিভ্রম (Optical illusion)। ব্ল্যাক হোল গঠিত হবার জন্যে যেমন অসীম সময়ের দরকার হয় না, তেমনি ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্ত ভেদ করতেও এত সময় লাগে না। আপনি দিগন্তের যত কাছাকাছি হবেন, আপনার কাছ থেকে আসা আলো জায়েদের কাছে পৌঁছতে ক্রমেই বেশি সময় লাগতে থাকবে। অন্য দিকে, আপনি দিগন্ত পাড়ি দিয়ে ভেতরে যাবার সময়ে নিঃসৃত আলোটুকু কখনোই ওর কাছে যাবে না, এটা চিরকাল ভেসে থাকবে দিগন্তেই। এর ফলে, আপনি চির দিনের জন্যে ব্ল্যাক হোলে হারিয়ে গেছেন, আর কোন দিন ফিরেও আসবেন না- এই খবরটুকুও জায়েদ জানতে পারবে না। ওর কাছে মনে হবে, কোন কারণে আপনার ব্ল্যাক হোলে প্রবেশ করতে দেরি হচ্ছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি আরেকভাবে চিন্তা করা যায়। দূরবর্তী অঞ্চলের চেয়ে ঘটনা দিগন্তের কাছে সময় অনেকটা ধীরে প্রবাহিত হয়। ধরুন, আপনি নভোযানে চড়ে ঘটনা দিগন্তের বাইরের একটি জায়গায় ভেসে থাকলেন (পতন থেকে রক্ষা পেতে বিপুল জ্বালানি পুড়িয়ে)। এবার আপনি যদি জায়েদের সাথে গিয়ে দেখা করুন, দেখা যাবে ওর বয়স আপনার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। কারণ, ব্ল্যাক হোলের কারণে ওর তুলনায় আপনার সময়ের গতি ছিল ধীর।
আচ্ছা, দুইটির ব্যাখ্যার কোনটি আসলে সঠিক? ব্যাপারটা নির্ভর করে ব্ল্যাক হোল সম্পর্কিত আপনার স্থানাঙ্ক ব্যবস্থার ওপর। সোয়ার্জসাইল্ড স্থানাঙ্ক নামে পরিচিত প্রচলিত স্থানাঙ্ক বিবেচনা করলে, আপনি দিগন্তে পাড়ি দিবেন স্থানাঙ্কের মানে সময় (t) যখন অসীম হবে। ফলে, স্থানাঙ্কের এই হিসেব অনুসারে, দিগন্ত পার হতে আপনার অসীম সময়ই লাগবে। এর কারণ হচ্ছে, সোয়ার্জসাইল্ড স্থানাঙ্ক ঘটনা দিগন্তের নিকটবর্তী অঞ্চলের বিকৃত দৃশ্য প্রদান করে। আর ঠিক দিগন্তের ওপরে স্থানাঙ্ক নিরতিশয় (Infinitely) বিকৃত হবে।
আপনি যদি স্থানাঙ্ককে এরূপ বিকৃতির হাত থেকে বাঁচাতে চান, তবে বিকল্প উপায়ে হিসাব করলে ,আপনার দিগন্ত ভেদ করতে প্রয়োজনীয় সময়ের (t) সসীম একটি মান পাবেন। কিন্তু, জায়েদ যে সময় আপনাকে তা করতে দেখবে সেই সময়টি আবার অসীম। ওর কাছে আসলে আপনার খবর পৌঁছতে অসীম সময় লাগবে। আপনি যে কোনো স্থানাঙ্ক ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে পারেন বটে, ফলাফল একই পাবেন। এ জন্যে আসলে দুটো ব্যাখ্যাই সঠিক এবং একই কথার দ্বিরূপ মাত্র।

বাস্তবে আসলে খুব বেশি সময় গড়াবার আগেই আপনি জায়েদের নজর থেকে উধাও হয়ে যাবেন। ব্ল্যাক হোল থেকে দূরে ধাবিত আলো লাল সরণ (Red shift) প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হবে। আপনি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কোন দৃশ্যমান আলো নির্গত করলে জায়েদের কাছে যেতে যেতে এর তরঙ্গদৈর্ঘ্য দীর্ঘতর হয়ে পড়বে। আপনি দিগন্তের কাছাকছি হতে থাকলে, তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়েই চলবে। একটা সময় তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান পাল্লাকে ছাড়িয়ে যাবে। এটা হয়ে যাবে অবলোহিত বিকিরণ এবং পরে বেতার বেতার তরঙ্গে পরিণত হবে। এক সময় তরঙ্গদৈর্ঘ্যে এত দীর্ঘ হবে যে জায়েদের চোখে এটি আর ধরা পড়বে না।
অন্য দিকে, আলো নির্গত হয় ফোটন নামক স্বতন্ত্র গুচ্ছ আকারে। ধরুন, আপনি দিগন্ত ত্যাগ করার সময় শেষ আলোকবিন্দু নির্গত করলেন। এই আলো জায়েদের কাছে কোন সসীম সময়েই পৌঁছবে। উপরোক্ত লক্ষ সূর্যের সমান ভরের ব্ল্যাক হোলের ক্ষেত্রে এতে সময় লাগবে ঘণ্টাখানেকেরও কম। এর পর? ও আর কিছুই দেখবে না। আপনি ভেতরে ডুব দিয়ে আর যে আলোই নিক্ষেপ করবেন, তা আপনার প্রিয় বন্ধুর সান্নিধ্যে আর কখনো পৌঁছাবে না। আপনি চিরতরে হারিয়ে গেলেন ব্ল্যাক হোলের গভীরে। এর পর তোমার কী হবে? এটা পরের কোনো পর্বে দেখবো। ব্ল্যাক হোলে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে পড়ে নিয়েন। আর আসলে সেটাতো আপনিই আমাদের চেয়ে ভালো জানবেন, তাই না?

তবে, ব্ল্যাক হোলে গেলেই সব শেষ- ব্যাপারটি পুরোপুরি এমনও নয় কিন্তু। আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বেরই একটি সমাধান অনুসারে ব্ল্যাক হোলের অভ্যন্তরে তৈরি হয় ওয়ার্মহোল। ওয়ার্মহোল হচ্ছে স্থান-কালের এক পয়েন্ট থেকে আরেকটি পয়েন্টে পৌঁছে যাবার শর্টকাট পথ। এটা হতে পারে কোন স্থান বা সময় থেকে অন্য কোন সময় –অতীত বা বর্তমানে বা অন্য কোন সময়েরই মহাবিশ্বের অন্য কোন স্থান (যেমন অন্য কোন গ্যালাক্সি) এমনকি হতে পারে অন্য কোন মহাবিশ্বেও! আগামী কোনো পর্বে আমরা ওয়ার্মহোল ও টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে বিস্তারিত জানবো।

গত পর্বে প্রশ্ন ছিল, স্টেলার ব্ল্যাক হোলরা কেন জীবনের অন্তিম সময়েই ব্ল্যাক হোল হয়? এ সময়তো তাদের ভর অনেক কমে যায়। জীবনের শুরুতেই কেন হয় না, যখন ওদের ভর থাকে তুলনামূলক বেশি?
উত্তরঃ জীবনের শুরুতে এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একটি নক্ষত্রে দুইটি বল কাজ করে। একটি এর নিজস্ব অভিকর্ষজনিত অন্তর্মুখী চাপ এবং অপরটি ফিউশন বিক্রিয়াজনিত বহির্মুখী চাপ। এই দুটি বলে একে অপরকে নাকচ করে দিয়ে নক্ষত্রকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে এটি যখন মৃত্যুমুখে পতিত হয় তখন অভিকর্ষকে ঠেকানোর মত আর কোন কার্যকরী বল থাকে না। এই কথা অবশ্য যথেষ্ট ভরযুক্ত নক্ষত্রের জন্যে প্রযোজ্য। কম ভরের ক্ষেত্রে আবার সংকোচনশীল বস্তুর নিজদের সাথে সংঘর্ষজনিত ডিজেনারেসি প্রেসার অভিকর্ষকে কিছুটা প্রতিহত করে।

[লেখাটি ইতোপূর্বে কিশোরদের উপযোগী করে ব্যাপন ম্যগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল।]

আগের পর্বগুলো পড়ুনঃ
☛ পর্ব ১ঃ ব্ল্যাক হোলের পরিচয়
☛ পর্ব-২ঃ ব্ল্যাক হোলের জন্ম
☛ পর্ব-৩ঃ ব্ল্যাক হোল কত বড়?  
Category: articles

Monday, April 18, 2016

গত দুই পর্বে আমরা ব্ল্যাকহোলের পরিচয় ও জন্ম-প্রক্রিয়া নিয়ে জেনেছিলাম। আমরা এবারে জানবো এদের আকার ও আয়তন নিয়ে। আলোর বেগকে আটকে ফেলে যে ব্ল্যাকহোল তার অবয়বও নিশ্চয় অনেক বড়। দেখা যাক, এই ধারণা কতটুকু সঠিক। সাধারণত কোন বস্তু কত বড় তা বিবেচনা করতে গেলে আমরা শুধু তার দৈর্ঘ্য বা দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক বস্তুর ক্ষেত্রে যথাক্রমে ক্ষেত্রফল ও আয়তন দিয়ে হিসেব করি। বাস্তবে অবশ্য দ্বিমাত্রিক বস্তুর গুরুত্ব না থাকায় আমরা আয়তনকেই এ ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড ধরি। সেই হিসেবে ব্ল্যাকহোলদের নিয়েও এভাবেই চিন্তা করা উচিত।
কিন্তু সমস্যা আছে দুটো। আমরা ইতোমধ্যেই জানি, মহাকর্ষের নিউটনীয় ধারণা ব্ল্যাকহোলের চিন্তা মিচেল-ল্যাপ্লাস সাহহেবদের মাথায় আনলেও আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাই(General Relativity) ব্ল্যাকহোল তত্ত্বকে মজবুত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছে। এ সত্ত্বেও আইনস্টাইন নিজেও বাস্তবে ব্ল্যাকহোল আছে বলে বিশ্বাস করতেন না (অবশ্য তাঁর সেই বিশ্বাসের কারণ এই যুগে এসে নড়বড়ে হয়ে গেছে)। সত্যি বলতে ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের ভেতরে ঠিক কী ঘটে তা কেউ জানে না! আবার এর কেন্দ্রে (সিঙ্গুলারিটি, যেখানে সমগ্র ভর একটি বিন্দুতে সীমাবদ্ধ) ভেঙ্গে পড়ে পদার্থবিদ্যার সব সূত্র। এমনকি বিভিন্ন সূত্র যেমন কোয়ান্টাম ফিজিক্স ও আপেক্ষিকতার মধ্যে চলে পারস্পরিক বৈরিতা। একটু আগে আমরা ব্ল্যাকহোলকে ত্রিমাত্রিক হিসেবে ধরে আকার বা আয়তন হিসেব করবো ভেবেছি। কিন্তু ব্ল্যাকহোল যে আসলে কত মাত্রার বস্তু তাও কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না। এটা হতে পারে চার, পাঁচ, দশ বা অন্য যে কোন মাত্রার!
আরেকটি সমস্যা বলি। এটা ঠিক সমস্যা নয়, বলা যায় বিকল্প চিন্তা। মহাজাগতিক বস্তুগুলো কত বড় এটা বোঝার জন্যে দুটি প্যারামিটার ব্যাবহার করা যেতে পারে। একটি হচ্ছে, বস্তুটির আসলেই আয়তন কত। অপরটি হচ্ছে তার ভর। মনে করা ঠিক হবে না, ভর ও আয়তন সব সময় একে অপরের সমানুপাতিক। অর্থ্যাত একটি বাড়লেই আরেকটিও বাড়বে- এমনটি নাও হতে পারে। প্রথম পর্বেই আমরা এটা জেনেছিলাম। তবে, এখানে আরেকটু বিস্তারিত দেখি।
আমরা ভর ও আয়তনের সম্পর্কটি জানি,
M = ρV
যেখানে,M = বস্তুর ভর, ρ = ঘনত্ব এবং V = আয়তন।
সাধারণ হিসাবে এ সূত্র অনুসারে, ভর আয়তনের সমানুপাতিক। অর্থ্যাৎ, আয়তন বাড়লে ভরও বাড়বে। তার মানে, ভর বাড়লে আয়তনও বাড়বে, তাই না? আসলে কিন্তু সব সময় তা হবে না। কেন? একটু ভাবুন, তারপরে আবার সামনে পড়ুন। প্রথমত, এখানে আমরা আলোচনা করছি বিশাল বিশাল মহাজাগতিক বস্তুদের নিয়ে। এদের ক্ষেত্রে ভর বাড়ার অর্থ হচ্ছে বস্তুর অভিকর্ষ লক্ষ্যনীয়ভাবে বেড়ে যাওয়া, যার পরিণতি অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী অভিকর্ষ যা বস্তুটির নিজের উপরেই কার্যকর হয়ে একে গুটিয়ে ছোট্টতর করে ফেলবে। এমন ঘটনা নিউট্রন স্টার বা হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা শ্বেত বামন নক্ষত্রদের বেলায়ও ঘটে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে বস্তুটির ঘনত্ব। উপরের সূত্রে আয়তন বাড়লে ভরকেও যদি বাড়তে হয় তবে সেক্ষেত্রে বস্তুর ঘনত্ব স্থির থাকতে হবে। অন্যথায় আয়তন বেশি থাকা বস্তুও যদি তারচেয়ে কম আয়তনের বস্তুর চেয়ে কম ঘনত্বের অধিকারী হয়, তবে প্রথম বস্তুর ভর কম হয়ে যেতে পারে।
এই দুই বিষয়ের যৌথ খপ্পরে পড়ে ভর বাড়ার সাথে সাথে আয়তনের বৃদ্ধি ও হ্রাস-দুটোই ঘটতে পারে। যেমন ধরুন আমাদের গত সংখ্যায় আলোচিত নিউট্রন স্টারদের কথা।
এদের ভর সূর্যের কয়েকগুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও ব্যাসার্ধ হয় মাত্র ৭ মাইলের মতো! কল্পনা করা যায়! ফলে দেখা যায় এদের প্রতি ঘন মিটারে 3.7×1017 থেকে 5.9×1017 কেজি পর্যন্ত ভর জড় হয়ে থাকে। অথচ আমাদের সূর্যের প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে মাত্র ১ দশমিক ৪ গ্রামের কাছাকাছি ভর থাকে! ঘনত্বের কি বিশাল ফারাক!
অন্য দিকে উল্টো ঘটনাও ঘটে। যেমন সুপারম্যাসিভ (Supermassive) তথা অতি উচ্চ ভরবিশিষ্ট ব্ল্যাকহোলদের আয়তনও হতে পারে সূর্যের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। যেমন এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া প্রস্তাবিত ব্ল্যাকহোলদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভরযুক্ত দানবের ভর সূর্যের ৪০ বিলিয়ন গুণ। তাই বলে আয়তন কিন্তু ছোট হয়ে যায়নি। এর ব্যাসও বিশাল- প্রায় ২৩৭ বিলিয়ন কিলোমিটার।

তবে এখানে একটু সাবধান হতে হবে। অন্যান্য বস্তুদের মত করে ব্ল্যাক হোলের আকার চিন্তা করলে ভুল হয়ে যেতে পারে। ব্ল্যাক হলের সমগ্র ভর একটি ক্ষুদ্র বিন্দুতে আবদ্ধ থাকে যার আয়তন প্রায় শুন্য। তাই আমরা যখন ব্ল্যাক হোলের আয়তন বা ব্যাসার্ধ বলব, বুঝতে হবে এটা আসলে ব্ল্যাক হলের ঘটনা দিগন্তের (যে দূরত্ব থেকে কিছুই, এমনকি আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না) পরিমাপ। তাই উপরের ভর-আয়তনের সূত্রের আলোচনা ঠিক সাধারণ অর্থে ব্ল্যাক হোলের জন্যে কাজ করবে না। অন্য অর্থে বলা যায় সবচেয়ে সুন্দরভাবে কাজ করবে। কারণ আমরা দেখাতে চেয়েছিলাম ভর বাড়লে আয়তন কমতেও পারে। সেটার সবচেয়ে ভালো উদাহরণতো ব্ল্যাক হোলই।
ফলে, এ পর্যন্ত আমরা যা বুঝলাম, মহাজাগতিক বস্তুদের ক্ষেত্রে বড়ত্বের হিসাবে নিছক আয়তনকে নয়, ভরকেও বিবেচনা করতে হবে। তাহলে আমরা এবার দেখার চেষ্টা করি এই দুই দিক দিয়ে ব্ল্যাকহোলরা কত বড় হতে পারে।
প্রথমে ভরের কথা বলা যাক। সত্যি বলতে একটি ব্ল্যাকহোলে সর্বোচ্চ ঠিক কত ভর থাকতে পারে, তার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। বেশি ভরের পাশাপাশি অল্প পরিমাণ ভর যুক্ত হয়েও ব্ল্যাকহোলের অন্ধকার রাজ্য গড়ে উঠতে পারে যদি এর ঘনত্ব হয় অতি উচ্চ। তবে, এখন পর্যন্ত জানা তথ্য মতে যেহেতু অধিকাংশ ব্ল্যাকহোলদেরই জন্ম বেশি ভরযুক্ত (Massive)  নক্ষত্রদের জীবনের ক্রান্তিলগ্নে, তাই আমরা বলতে পারি, একটি ব্ল্যাকহোলের ভর একটি ভারী নক্ষত্রের ভরের কাছাকাছি।

আমরা গত পর্বেই দেখেছি, এই স্টেলার ব্ল্যাকহোলরা সূর্যের ১৫ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি ভর ধারণ করতে পারে। তাহলে তাদের ভর কত হবে? এটা বোঝার জন্যে আমাদেরকে নিছক সূর্যের ভর জানতে হবে যা আমরা জানি যে, ১০৩০ কেজি। তাহলে একটি সাধারণ ব্ল্যাকহোলের ভর হবে (যদি এর ২০ গুণ ধরি) ২৩৩ কেজি। চাইলে এবার তুমি নিজেই ২ এর পরে ৩২ খানা শুন্য বসালে যা হবে সেতাই এই ভর। উল্লেখ্য, এটা কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভরের নিম্ন সীমা। আগেই বলেছি, এর ভর সর্বোচ্চ কত হতে পারে তা বলার কোন উপায় নেই। তবে স্টেলার ব্ল্যাকহোলদের ক্ষেত্রে ভর খুব বেশি হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, এখন পর্যন্ত জানা তথ্য অনুসারে, সবচেয়ে বেশি ভরের তারকার ভর ২৬৫ সৌর ভরের সমান। এর নাম R136a1।
একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল

এতো গেল শুধু স্টেলার ব্ল্যাকহোলের কথা। কিন্তু সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলরা এতটা পিছিয়ে নেই। এদের ভর হতে পারে সূর্যের কয়েক লক্ষ গুণ থেকে শুরু করে কয়েকশো কোটি গুণ পর্যন্ত! ভাবা যায়! আমাদের মিল্কিওয়েসহ অধিকাংশ গ্যলাক্সির কেন্দ্রে এদের বসবাস। অন্য দিকে আরেক জাতের ব্ল্যাকহোল হচ্ছে মিনি বা মাইক্রো ব্ল্যাকহোল। আমরা জানি, কোন বস্তুকে ব্ল্যাক হোল হতে হলে এর মুক্তিবেগ হতে হবে আলোর বেগের চেয়ে বেশি। অর্থ্যাৎ, কাউকে একটি ব্ল্যাক হোল উৎপাদন করতে হলে বস্তুর ভর বা শক্তিকে এত বেশি সঙ্কুচিত করতে হবে যে এর পৃষ্ঠ থেকে কোন বস্তুকে বের করতে হলে আলোর চেয়ে বেশি বেগ দিতে হবে।
তাহলেতো যে কোন ভরকেই যথেষ্ট পরিমাণ চেপে গুটিয়ে ফেলে ব্ল্যাকহোল বানিয়ে ফেলা সম্ভব, তাই না? তাত্ত্বিকভাবে অবশ্য তাই। কিন্তু আরো জটিল কিছু কারণে একটি ব্ল্যাকহোলের সর্বনিম্ন ভর হতে পারে প্ল্যাঙ্ক ভরের সমান তথা মাত্র ২২ মাইক্রোগ্রামের সমান। উল্লেখ্য, একটিমাত্র মৌলিক আধান (Charge) ধারণে সক্ষম ভরকে প্ল্যাংক ভর (Planck Mass) বলা হয়।
এবার চলুন দেখি ব্ল্যাকহোলদের আকার কেমন হতে পারে। আমরা যেহেতু জানি, ব্ল্যাকহোলের মুক্তিবেগ অন্তত আলোর বেগের সমান হতে হবে, এই তথ্য কাজে লাগিয়ে আমরা এদের ন্যূনতম ব্যাসার্ধ বের করতে পারি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ব্ল্যাকহোল নামক বস্তুটির ব্ল্যাকহোলসুলভ আচরণ শুধু তার ঘটনা দিগন্ত বা তার ভেতরের অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। কারণ, এই সীমার ভেতরের কোন ঘটনা আমরা দেখতে না পেলেও বাইরের ঘটনা দেখতে পাবো। আরেকভাবে বললে, আপনি যদি কখনো ব্ল্যাকহোল অভিযানে যান, তবে ঘটনা দিগন্ত পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক থাকবে। কিন্তু যেই আপনি এই সীমা ভেদ করে আরো ভেতরে যাবেন, তখনই আপনার ফিরে আসার সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যাবে। অবশ্য আশা যে একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়।
কারণ, তাত্ত্বিকভাবে ব্ল্যাকহোল টাইম ট্র্যাভেল ঘটাতে পারে, তৈরি করতে এক ডাইমেনশন থেকে আরেক ডাইমেনশনে যাবার, এমনকি আরেকটি ইউনিভার্সে পাড়ি দেবার জন্যে ওয়ার্মহোল নামক টানেলও তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতের কোন পর্বে আমরা ওয়ার্মহোল ও টাইম ট্র্যাভেল নিয়ে জানবো, ইনশা-আল্লাহ। যাই হোক, এখন তাহলে মূলত, ব্ল্যাকহোলের আকার বা ব্যাসার্ধ বলতে আসলে আমরা ঘটনা দিগন্তের (Event horizon) ব্যাসার্ধ জানতে চাচ্ছি।
এই ঘটনা দিগন্তের ব্যাসার্ধ সর্বপ্রথম বের করেন জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল সোয়ার্জসাইল্ড। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়ে যুদ্ধকালীন সময়েই এই গাণিতিক হিসাবখানি প্রস্তুত করেন। তাঁর নামানুসারে এক বিশেষ ধরনের ঘটনা দিগন্তের ব্যাসার্ধকে সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধ (Schwarzschild radius) বলা হয়। এই ব্যাসার্ধ্য ব্ল্যাকহোলের ভরের সাথে সমানুপাতিক। সূত্রটি হচ্ছে,

যেখানে, R = সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধ, G = মহাকর্ষীয় ধ্রুবক, M = ব্ল্যাকহোলের ভর এবং c = আলোর বেগ যা সেকেন্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার বা ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৬ মাইল থেকে শুরু করে সৌরজগতের সমানও ঘটনা দিগন্ত খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু এই সূত্র দিয়ে হিসাব করলে আমরা তাত্ত্বিকভাবে আরো ক্ষুদ্র বা বড় ব্ল্যাকহোলও পাব। যেমন, পৃথিবীর সমান ভরের কোন বস্তুকে যদি ব্ল্যাকহোল হতে হয়, তবে এর ভরকে গুটিয়ে এতটা সঙ্কুচিত করতে হবে যে তখন এর আকার দাঁড়াবে একটি ক্ষুদ্র মার্বেলের সমান। বিশ্বাস না হলে উপরের সূত্রে পৃথিবীর ভর (৬×১০২৪ কিলোগ্রাম) বসিয়ে দেখুনই না!
আসলে ব্ল্যাকহোল হবার জন্যে খুব বেশি ভরের দরকার নেই, দরকার শুধু উপস্থিত ভরটুকুর গুটিয়ে যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষুদ্র জায়গায় অবস্থান করার। একইভাবে আমাদের সূর্য যদি ব্ল্যাকহোল হতে চায় তবে এর ব্যাসার্ধ কমিয়ে বানিয়ে দিতে হবে ৩ কিলোমিটারের কাছাকাছি। এমনকি তাত্ত্বিকভাবে মাউন্ট এভারেস্টের সমান পাহাড়ও ব্ল্যাকহোল হতে পারবে যদি এর ভরকে গুটিয়ে এত ছোট বানাতে হবে এর সোয়ার্জসাইল্ড ব্যাসার্ধ দাঁড়াবে এক ন্যানোমিটারের চেয়েও অনেকটা ক্ষুদ্র।  কিন্তু বাস্তবে মাউন্ট এভারেস্ট, পৃথিবী বা সূর্য কারো পক্ষেই ব্ল্যাকহোল হওয়া সম্ভব নয়। একটু ভাবুন কেন সম্ভব নয়। গত সংখ্যার লেখায় কিছু ক্লু পাবে। বিস্তারিত আমরা অন্য পর্বে দেখবো, ইনশাআল্লাহ।
অন্য দিকে, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি নিজেই যদি একটি ব্ল্যাকহোল হবার আশা পোষণ করে তবে এর ঘটনা দিগন্তের ব্যাসার্ধ হবে প্রায় ২ কোয়াড্রিলিয়ন মিটার। ২ এর ১৫ শুন্য বসিয়ে দেখুন সংখ্যাটি কত বিশাল।  তবে এই দৈর্ঘ্য কিন্তু মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির নিজের ব্যাসার্ধ্যের চেয়ে ৫ লক্ষ গুণ ছোট।
আশা করি, শেষের দিকের এই আলোচনা সংক্ষেপে আমাদের গত পর্বের বিদায়ী প্রশ্নের জবাব সংক্ষেপে হলেও দিয়েছে। প্রশ্নটি ছিল অতি অল্প পরিমাণ ভর নিয়ে কিভাবে ব্ল্যাকহোল, সত্যি বলতে মাইক্রো ব্ল্যাকহোল তৈরি হতে পারে? এর জবাব আমরা আরো বিস্তারিত জানবো অন্য পর্বে। চলে যাচ্ছি আরেকটি বিদায়ী প্রশ্ন দিয়ে। গত পর্বে আমরা দেখেছিলাম, তারকাদের জীবনের শেষের দিকেই কেবল স্টেলার ব্ল্যাকহোল তৈরি হতে পারে। অথচ জীবনের শুরুতেই এর ভর ছিল আরো বেশি। কারণ, জীবনের শেষের দিকে পৌঁছতে গিয়ে এর জ্বালানি খরচ করে আলো, তাপ ইত্যাদি উৎপন্ন করতে হয়েছে। ফলে, শেষের দিকে এর ভরতো আইনস্টাইনের E=MC2 সূত্র মেনে শক্তি রূপে অনেকটাই কমে গেছে। প্রশ্ন হলো, জীবনের শুরুতেই এর ভর কেন একে ব্ল্যাকহোল বানায়নি? চিন্তা করুন। বুঝতে পারলে আমাকে জানাতে পারেন, এই নাম্বারে- 01515-(5563233)7। নাম্বারটি বুঝতে অসুবিধা হলে আপাতত কিছু করার নেই- এই লিঙ্কটি দেওয়া ছাড়া।

তথসূত্রঃ
১। http://cfpa.berkeley.edu/Education/BHfaq.html#q2
2. https://en.wikipedia.org/wiki/Neutron_star
৩। https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_most_massive_stars_known
৪। https://en.wikipedia.org/wiki/Supermassive_black_hole
৫। http://csep10.phys.utk.edu/astr162/lect/active/smblack.html
৬। http://hubblesite.org/explore_astronomy/black_holes/encyc_mod3_q3.html
৭। https://en.wikipedia.org/wiki/Schwarzschild_radius
৮। https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_most_massive_black_holes

Category: articles

Sunday, March 27, 2016

গত পর্বে আমরা ব্ল্যাক হোলের সাথে প্রথমিক পরিচিতি সেরেছিলাম। এবার আমরা দেখবো, কিভাবে জন্ম নেয় এই দানবেরা। ব্ল্যাক হোল আবার আছে তিন রকমের- স্টেলার বা নাক্ষত্রিক (Steller), Supermassive বা অতি ভারী ও খুবই ছোট্ট আকারের মাইক্রো বা মিনিয়েচার ব্ল্যাক হোল (Miniature Black Hole)। আজকে আমরা মূলত প্রথম ধরনের তথা স্টেলার ব্ল্যাক হোল নিয়েই জানবো। এদের জন্ম হয় একটি নক্ষত্রের জীবনের শেষের দিকে, যখন এর সবটুকু জ্বালানী নিঃশেষ হয়ে যায়।
এই ধরনের ব্ল্যাক হোল যেহেতু একটি নক্ষত্রের জীবনের অন্তিম দশা, তাই এর জন্মলাভের উপায় জানতে হলে নক্ষত্রের জীবনচক্র বুঝতে হবে। আমাদের তাহলে বুঝতে একটি নক্ষত্রের জন্ম হয় কিভাবে। জন্মের পরে এর মধ্যে কী ঘটতে থাকে? কিভাবে এটি আলো, তাপ ও বিকিরণের মাধ্যমে এর শক্তির বহিঃপ্রকাশ করে হুঙ্কার ছাড়ে, কিভাবে এটি আস্তে আস্তে বার্ধক্যে উপনীত হয় এবং মারা যায়।
আচ্ছা, তারও আগে জেনে নিই, নক্ষত্র বা তারকা (Star) কাকে বলে? সাধারণত তারকা হচ্ছে সেইসব মহাজগতিক বস্তু যারা এদের অভ্যন্তরে ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আলো, তাপ ও বিকিরণ উৎপন্ন করে। মহাবিশ্বের ৫০ ভাগ তারকারই বাইনারি স্টার বা জোড়া তারা (Binary Star)। এরা অন্য আরেকটি তারকার সাথে চুক্তি করে একে অপরকে প্রদক্ষিণ করে। আর, প্রদক্ষিণকেন্দ্র হয় দু'জনের অভিকর্ষ কেন্দ্র (Center of Gravity) যেখানে থাকে সেখানে।
অবশিষ্ট  তারকারা আমাদের সূর্যের মত গড়ে তুলেছে গ্রহব্যবস্থা (Planetary System)। আমরা রাতের আকাশে যেসব উজ্জ্বল তারা দেখি, তার মধ্যে চাঁদের পরে যথাক্রমে ১ম, ২য় ও ৩য় উজ্জ্বল বস্তু শুক্র, বৃহস্পতি ও শনি- সবাই কিন্তু গ্রহ, তারকা নয়, তাই এদের নিজস্ব আলোও নেই। এরাও চাঁদের মতই সূর্যের আলোর প্রতিফলন ঘটায়।
এবার দেখা যাক, কিভাবে জন্ম নেয় নক্ষত্র। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিসহ সব গ্যালাক্সিতেই রয়েছে প্রচুর পরিমাণ গ্যাসীয় মেঘ ও ধূলিকণা। প্রাথমিক অবস্থায় এদেরকে বলা হয় নীহারিকা বা নেবুলা (Nebula)। সাধারণত এক একটি নেবুলা আড়াআড়িভাবে বহু আলোকবর্ষ পরিমাণ জুড়ে বিস্তৃত থাকে। একটি নেবুলাতে যে পরিমাণ গ্যাস থাকে তা দিয়েই আমাদের সূর্যের মতো কয়েক হাজার নক্ষত্রের জন্ম হতে পারে।  নেবুলার অধিকাংশ উপাদানই হচ্ছে বিভিন্ন হালকা গ্যাস- বিশেষ করে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের অণু। এই সমস্ত গ্যাস ও ধূলিকণা যখন ঘনীভূত হয়ে যথেষ্ট পরিমাণ অভিকর্ষ উৎপন্ন করে, তখন নিজস্ব অভিকর্ষের চাপে সঙ্কুচিত হতে থাকে। কোন কোন জ্যোতির্বিদ আবার মনে করেন, এই অন্তর্মুখী সঙ্কোচনের জন্য শুধু অভিকর্ষই নয়, গ্যাস ও ধূলিকণায় সৃষ্ট চৌম্বকক্ষেত্রও দায়ী।
নক্ষত্র তৈরির কাঁচামাল নেবুলা 
গ্যাসগুলো জড় হতে হতে বিভব শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং বাড়িয়ে ফেলে তাপমাত্রা। তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে সঙ্কোচনশীল গ্যাস বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে এক একটি আলাদা নক্ষত্র তৈরি হয়।  এই তারকার অন্তর্বস্তুর সঙ্কোচনের হার হয় অনেক বেশি। এর গ্যাসীয় মেঘ অনেক দ্রুত আবর্তন করে করে এর কৌণিক ভরবেগ বজায় রাখে। এক সময় এই নক্ষত্রের তাপমাত্রা প্রায় ২ হাজার কেলভিনে পৌঁছায়। এই অবস্থায় হাইড্রোজেন অণু ভেঙ্গে গিয়ে মৌলটির পরমাণুতে পরিণত হয়। এর তাপমাত্রা এক সময় উঠে যায় ১০ হাজার কেলভিনে। সঙ্কুচিত হয়ে সূর্যের প্রায় ৩০ গুণ আয়তন লাভ করলে এই নব-সৃষ্ট তারকাকে বলে প্রোটো স্টার বা ভ্রুণ তারা (Protostar)। এবার এতে হাইড্রোজেন পরমাণু জোড়া লেগে লেগে হিলিয়ামে পরিণত হতে থাকে। এই নিউক্লিয় বিক্রিয়াটিকে বলে ফিউশন বা সংযোজন (Fusion) বিক্রিয়া।

ফিউশন বিক্রিয়া শুরু হয়ে গেলেই তারকার অভ্যন্তরে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। কাদের মাঝে হয় এই ধাক্কাধাক্কি? একটি পক্ষ হচ্ছে তারকার ভেতরের দিকের নিজস্ব অভিকর্ষজ টান। এতক্ষণ সে একাই ছিল। কিন্তু ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে সে পেল একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। এটি হচ্ছে উপরোক্ত নিউক্লিয় বিক্রিয়াজনিত বহির্মুখী চাপ। এই দুই চাপের চাপাচাপিতে পড়ে নক্ষত্রটি স্থিতিশীল অবস্থায় জীবন পার করতে থাকে। সরবরাহ করে যেতে থাকে আলো, তাপ ও বিভিন্ন উপকারী ও অপকারী রশ্মি ও বিকিরণ।

সূর্যের কাছাকাছি ভরের একটি তারকা এই দশায় অবস্থান করে প্রায় ১০ বিলিয়ন বা একশো কোটি বছর। আমাদের সূর্যে ৫ বিলিয়ন বছর আগে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। চলতে থাকবে আরো প্রায় একই পরিমাণ সময় ধরে। এই দশায় অবস্থান করার সময় একটি তারকাকে বলা হয় মেইন সিকুয়েন্স বা প্রধান ক্রমের তারকা (Main sequence Star)। বর্তমানে মহাবিশ্বের ৯০ ভাগ তারকাই এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত।

একটা সময় নক্ষত্রের হাইড্রোজেন জ্বালানী ফুরিয়ে যায়। এবার তারকার অভ্যন্তরস্থ মূলবস্তু আরো সহজে ভেতরের দিকে চুপসে যায় কেননা চুপসে যাবার পক্ষে কার্যকরী বল অভিকর্ষের শত্রু যে দুর্বল হয়ে পড়েছে! কিন্তু তারকার বাইরের অংশ প্রসারিত হতেই থাকে। ফলে সামগ্রিকভাবে এর ব্যাসার্ধ্য বেড়ে যায়। এই অবস্থায় এদেরকে দানব নক্ষত্র (Giant Star) বা আরো বড় দানবদের সুপারজায়ান্ট বলে ডাকা হয়। এই ধাপেও ফিউশন ঘটে অপেক্ষাকৃত ভারী মৌল যেমন কার্বন, অক্সিজেন প্রভৃতি উৎপন্ন হয়। এখন থেকে আরো ৫ শো বছর পরে আমাদের সূর্য মামা দানব নক্ষত্র হয়ে যাবে। এর পরিধি এসে পৌঁছাবে প্রায় পৃথিবী পর্যন্ত। তার আগেই কিয়ামত না ঘটে গেলে এটাই হবে পৃথিবী ও তাতে অবস্থিত প্রাণের কফিনে শেষ পেরেক।
নক্ষত্রের জীবনচক্র
বর্তমানেও রাতের আকাশে বেশ কিছু দানব বা মহাদানব নক্ষত্রের দেখা মেলে। যেমন আদমসুরত বা কালপুরুষ (Orion) তারামণ্ডলীর আর্দ্রা (Betelgeuse) একখানা সুপারজায়ান্ট বা মহাদানব নক্ষত্র। এছাড়াও বৃশ্চিক মণ্ডলীর জ্যেষ্ঠা (Antares) ও আদমসুরতের রিজেল ও ভূতেশ তারামণ্ডলীর স্বাতীও (Arcturus) সুপারজায়ান্ট গোত্ররে নক্ষত্র। অধিকাংশ দানব নক্ষত্রই লাল রং-এর অধিকারী হয়। উপরোক্ত তারকাগুলোও তাই। আর, এ জন্যেই রাতের আকাশে এদেরকে দেখতে লাল লাল মনে হয়।
এক সময় নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ফিউশন বিক্রিয়া অব্যাহত রাখার মত কোন জ্বালানী অবশিষ্ট থাকে না। এ অবস্থায় নক্ষত্রের ভরের উপর ভিত্তি করে নানান ঘটনা ঘটতে পারে।
যেসব তারকার ভর প্রায় দুই সৌর ভরের কাছাকাছি বা  তার কম তারা জ্বালানী শেষ হয়ে গেলে বাহিরের দিকে প্রসারণশীল আবরণ ছুঁড়ে ফেলে ভেতরের অংশকে আরো বেশি গুটিয়ে ফেলে। এক সময় এর আকার হয়ে যায় প্রায় পৃথিবীর সমান যদিও ঘনত্ব থাকে অনেক বেশি। এদেরকে বলে শ্বেত বামন (White Dwarf)। এক সময় শেষ আলোক বিন্দুটিও হারিয়ে ফেলে এরা কালো বামন নাম ধারণ করে। সাবধান! এরা এক সময় কালো হয়ে গেলেও এদেরকে কিন্তু ব্ল্যাক হোল ভেবে বলা যাবে না! এরা হচ্ছে শুধুই অনুজ্জ্বল নক্ষত্র। আর, ব্ল্যাক হোল হচ্ছে তারা যারা আলোকেও বন্দী করে রাখে। সে নিজেই আলোক উৎস হতে পারে, কিন্তু সেই আলো ঘটনা দিগন্তের সীমা পার হতে দেবে না। অন্য দিকে কালো বামনদের আলো বিতরণ করার সামর্থ্যই কিন্তু লোপ পাবে। এই পার্থক্য না থাকলে তো আমরা কয়লাকেও বা যে কোনো কালো জিনিসকেই ব্ল্যাক হোল বলে বসবো!
তাহলে ব্ল্যাক হোল কারা হবে? আরেকটু কথা বলে নিই।
যেসব তারকার ভর দুই থেকে পাঁচ বা কারো মতে ১৫ সৌর ভরের মধ্যে থাকে তারাও বাইরের আবরণ ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এদের ক্ষেত্রে এই ঘটনাকে বলে সুপারনোভা বিস্ফোরণ। এ সময় অনেক বেশি ঔজ্জ্বল্যের সৃষ্টি যায় যার রেশ পৌঁছে যায় অনেক দূর পর্যন্ত। যেমন বেটেলজিউস যখন বিস্ফোরিত হবে, এর রেশ ৬৪৩ আলোকবর্ষ দূরে, আমাদের পৃথিবীতে বসেই দেখা যাবে। অবশ্য আলোর বেগ সামান্য (!) হবার কারণে পৃথিবীর মানুষ সেই ঘটনা দেখবে ঘটনার ৬৪৩ বছর পরে! সুপারনোভা বিস্ফোরণের পরে নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষকে বলা হয় নিউট্রন স্টার। কারণ, এই সময় এর অভীকর্ষীয় চাপ এত প্রচণ্ড হয় যে এর অভ্যন্তরে ইলেকট্রন ও প্রোটন অভিকর্ষের খপ্পরে পড়ে স্বাধীনতা হারিয়ে মিলিত হয়ে নিউট্রনে পরিণত হয়। এদের সাথে আবার অনেক সময় জড়িত থাকে অতি উচ্চ চৌম্বকক্ষেত্র যা জন্ম দেয় নির্দিষ্ট সময় পর পর বেতার স্পন্দনের। এ সময় এদের বলে পালসার।
সুপারনোভা বিস্ফোরণ 

এই বার আমরা ব্ল্যাক হোলের কাছে যেতে পারি। সূর্যের চেয়ে অন্তত প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ ভারী তারকারাই জীবনের অন্তিম পর্যায়ে ব্ল্যাক হোল হবার সুযোগ পাবে। এরাও জায়ান্ট বা সুপারজায়ান্ট স্টারদের মতো সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে বাইরের আবরণ ছুঁড়ে ফেলে দেবে। ফলে, এবার বাকি অংশের ঘনত্ব বেশি হয়ে যাওয়ায় এবং ভর আগে থেকেই যথেষ্ট পরিমাণ থাকায় এদের অভিকর্ষ এতটা শক্তিশালী হবে যে আলোও এদের ঘটনা দিগন্ত থেকে বের হতে পারবে না। ঘটনা দিগন্ত কী এবং আলো এত বিপুল বেগ নিয়েও কিভাবে অভিকর্ষের খপ্পরে আটকা পড়ে, তা আমরা গত পর্বেই দেখেছি।
আজ শেষ করছি আরেকটি প্রশ্ন ও আগের পর্বে করা একটি প্রশ্নের জবাব দিয়ে। আমরা এখানে আলোচনা করেছি মূলত প্রধান ধরনের ব্ল্যাক হোলদের সম্পর্কে। বাকি দুই ধরনের ব্ল্যাক হোল কিভাবে জন্ম নেয়? ব্ল্যাক হোল আবার মাইক্রো তথা ক্ষুদ্র হয় কিভাবে? এমনকি একটি ব্ল্যাক হোলের ব্যাসার্ধ হতে পারে মাত্র ১৪৮ ফেমটো মিটার তথা  ১৪৮×১০−১৫ মিটার। কিন্তু কিভাবে? জানবো ভবিষ্যতে, ইনশা-আল্লাহ।

গত পর্বে আমরা বলেছিলাম, ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের কাছে একটি অবস্থান আছে যেখানে স্থান কালের বক্রতা ভেতরের দিকে অসীম না হয়ে বৃত্তপথের মতো তৈরি করবে। আসলে এই জায়গায় ব্ল্যাক হোলের বেপরোয়া মনোভাবের ইতি ঘটে। ফলে, এই জায়গার বস্তু আমরা দেখতে পাই। নামও আছে এর জন্যে। একে বলা হয় অ্যাক্রেশন ডিস্ক (Accretion Disk)। আশপাশের অঞ্চল থেকে পদার্থ ছিনতাই করে ব্ল্যাক হোল এর অন্ধকার কলেবরের চারপাশে এই দৃশ্যমান চাকতির প্রদর্শনী দেখায়। যাই হোক, পরের কোনো পর্বে আরো বিস্তারিত আলোচনার আশা রেখে আজকে বিদায়!


< আগের পর্বঃ প্রাথমিক পরিচিতি
Category: articles

Monday, February 22, 2016

ব্ল্যাক হোল কী জিনিস? ব্ল্যাক হোলের জন্ম হয় কিভাবে? ব্ল্যাক হোলের সাথে অভিকর্ষের কী সম্পর্ক? আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের সাথে ব্ল্যাকহোলের কোন সম্পর্ক আছে কি? ব্ল্যাক হোলকি টাইম ট্র্যাভেল ঘটাতে পারে? ওয়ার্মহোলের সাথে ব্ল্যাক হোলের সম্পর্ক কোন দিক দিয়ে? আলোর মতো এমন গতিমান জিনিস কিভাবে ব্ল্যাক হোলের গর্তে আটকা পড়ে?
ব্ল্যাকহোল নিয়ে এমন আরো নানান কিছু জানতে নিয়মিত আয়োজন ব্ল্যাক হোলের গভীরে।
ব্ল্যাক হোল

শুরু করি মহাকাশের মহাদানব এই ব্ল্যাকহোল তথা কৃষ্ণগহ্বরদের পরিচতি দিয়ে।
আপনার নিশ্চয়ই ক্রিকেট খেলার বা দেখার অভ্যাস আছে, তাই না? নিশ্চয়ই আছে ছক্কা মারারও অভ্যাস। অনেক সময় দেখা যায় ব্যাটসম্যানের বেধড়ক পিটুনি খেয়ে বেচারা বল অনেক উপরে উঠে যায়। কিন্তু অভিকর্ষ সম্পর্কে একটি জনপ্রিয় কথা প্রচলিত আছে- What goes up must come down। অর্থ্যাৎ, উপরে যে উঠবে, নিচেও তাকে নামতেই হবে। এই কথার প্রতিধ্বনি বাজাতেই যেন একটু পরেই বলটি আছড়ে পড়ে গ্যালারিতে, অথবা ভাগ্য খারাপ হলে ফিল্ডারের হাতে!
কেন উপরে ছুড়ে মারা বস্তু নিচে নেমে আসে? সহজ উত্তর- পৃথিবীর অভিকর্ষ। আচ্ছা, বলটিকে যদি আরেকটু জোরে মারা হতো, তাহলে কী হত? তখনও এটি নিচে নামত। তবে, একটু দেরিতে। আরেকটু জোরে মারলে? আরেকটু পরে। আরেকটু জোরে মারলে? আরেকটু পরে। এভাবেই কি চলতে থাকবে? না। সবকিছুরতো একটা সীমা আছে! (সব সময় অবশ্য না, গণিতবিদেরা আপত্তি করে বসবে!)
ধরুন, কোন ব্যাটসম্যানের গায়ে মিস্টার ইউনিভার্সের শক্তি ভর করেছে। সে বলটাকে এমন জোরে উপরে পাঠিয়ে দিল যে বলটি পৃথিবীর অভিকর্ষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মহাশুন্যে হারিয়ে গেল। এটাকি সম্ভব যে কোন বস্তুকে নির্দিষ্ট কোন বেগে মারলে এটি আর ভূমিতে ফিরে আসবে না? হ্যাঁ সম্ভব। এটা করার জন্যে পৃথিবী থেকে খাড়া উপরে ছোড়া বস্তুর ক্ষেত্রে প্রাথমিক বেগ হতে হবে প্রতি সেকেন্ডে ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার। এই বেগকে তাই বলা হয় মুক্তি বেগ (Escape Velocity)।
প্রকৃতপক্ষে মহাশুন্যে রকেট ও স্পেসশিপ পাঠানোর সময় এই মুক্তি বেগের কথা মাথায় রাখতে হয়। রকেটের প্রাথমিক বেগ দিতে হয় মুক্তি বেগের চেয়ে বেশি। নইলে কিন্তু “হোয়াট গোজ আপ, মাস্ট কাম ডাউন” কথাটি সত্য হয়ে যাবে।
এবার ধরুণ, কোনো গ্রহের ভর পৃথিবীর চেয়েও বেশি। তার ক্ষেত্রে এই মুক্তি বেগ হবে আরো বেশি [কেন?]। যেমন সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতির কথাই ধরুণ। এর পৃষ্ঠে মুক্তিবেগ হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে ৫৯.৬ কি.মি.। অন্য দিকে সূর্যের মুক্তিবেগ সেকেন্ডে ৬১৭.৫ কিলোমিটার। অর্থ্যাৎ সৌরপৃষ্ঠ থেকে নিক্ষিপ্ত কোন বস্তুকে সূর্যের আকর্ষণ কাটিয়ে বাইরে চলে যেতে হলে প্রাথমিক বেগ এই পরিমাণ হতে হবে। অবশ্য সমগ্র সৌরজগতের মুক্তি বেগ আরো খানিকটা বেশি।
আমরা এও জানি, সূর্য একটি সাধারণ ভরের তারকা। এর চেয়েও বিশাল ও বাঘা বাঘা তারকাদের উপস্থিতি রয়েছে খোদ আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতেই।
কোন বস্তুর মুক্তিবেগ নির্ভর করে দুটো জিনিসের উপর- সংশ্লিষ্ট বস্তুর ভর ও ব্যাসার্ধ। ভর বেশি হলে পৃষ্ঠে মুক্তি বেগ বেশি হবে, কিন্তু ব্যাসার্ধ বাড়লে কমে যাবে। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, ভর বাড়লেই যে ব্যাসার্ধও বাড়বে- এমনটি কিন্তু বলা যাবে না। কারণ, একেতো ঘনত্ব বেশি হলে কিন্তু ব্যাসার্ধ কমে যাবে। উপরন্তু ভর বেশি হবার অর্থ দাঁড়াবে অভিকর্ষ শক্তিশালী হয়ে যাওয়া। ফলে বস্তুটি নিজেরই অভিকর্ষের চাপে গুটিয়ে গিয়ে ছোট্টতর হয়ে যাবে। পর্যায় সারণির একই পর্যায়ে ডানে গেলে যেমন ঘটে অনেকটাই তেমন, তাই না?

এখন ধরুণ এমন একটি নক্ষত্র আছে যার ভর সূর্যের চেয়ে এত বেশি যে হিসেব করে এর পৃষ্ঠে মুক্তিবেগ যা পাওয়া গেল তা আলোর বেগের চেয়েও বেশি। তার অর্থ দাঁড়াবে ঐ নক্ষত্রের পৃষ্ঠ থেকে নিক্ষিপ্ত আলোও বেরিয়ে আসতে পারবে না। অবশ্য নক্ষত্রের জীবনের শুরুর দিকে এই অবস্থা ঘটে না, ঘটে যখন হাইড্রোজেন জ্বালানী ফুরিয়ে যায়। কেন? সেটা নিয়ে আমরা ভবিষ্যতে বিস্তারিত জানবো, ইনশা-আল্লাহ।
এখন, আমরা কোন বস্তু দেখি তখনই যখন বস্তুটি থেকে নির্গত আলো আমাদের চোখে এসে পড়ে। কিন্তু কোন বস্তু থেকে যদি আলো আসতে না পারে তাহলে তাকে আমরা দেখবো না। ফলে, যে নক্ষত্রের মুক্তি বেগ আলোর চেয়ে বেশি সেটি আমরা দেখতে পাবো না। তখন এর নাম হবে ব্ল্যাক হোল। ঠিক এ কারণেই ব্ল্যাক হোল আমরা দেখি না। আর এ এজন্যেই এর নাম ব্ল্যাক হোল (Black hole) বা ‘অন্ধকার গর্ত’ যাকে বাংলায় ডাকা হয় কৃষ্ণবিবর বা কৃষ্ণগহ্বর বলে।
তাহলে, ভর অল্প হওয়াতে গ্রহরা কিন্তু কখোনই ব্ল্যাকহোল হবার সুযোগ পাবে না। সব তারকারাও পাবে না। সুযোগ শুধু তারাই পাবে যাদের ভর সূর্যের অন্তত ১৫-২০ গুণ। অর্থ্যাৎ আমাদের সূর্যও কখনো ব্ল্যাক হোল হতে পারবে না।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জোরালো অনুমান হচ্ছে প্রত্যেকটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে অনেক বিশাল বিশাল ভরের ব্ল্যাকহোল যাদের ভর হতে পারে সূর্যের কয়েকশো বিলিয়ন গুণ পর্যন্ত! যেমন আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই স্যাজাইটেরিয়াস এ স্টার (Sagittarius A*) নামক অবস্থানে একটি ব্ল্যাকহোল আছে বলে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দৃঢ় বিশ্বাস।
আমরা একটু আগে দেখলাম, ব্ল্যাকহোল থেকে কোন কিছু বেরিয়ে আসতে পারে না। কিন্তু ব্ল্যাকহোলের রাজত্বতো নিশ্চয়ই পুরো মহাকাশজুড়ে বিস্তৃত নয়। এর কেন্দ্র থেকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্ছলের বাইরের কোন বস্তুকে এটি গ্রাস করতে পারবে না। সেই সীমানার নাম ইভেন্ট হরাইজন (Event Horizon) বা ঘটনা দিগন্ত। এটাই মূলত সেই পয়েন্ট যেখান পর্যন্ত বস্তুটির অভিকর্ষ এত বেশি শক্তিশালী যে এর মুক্তি বেগ আলোর বেগের চেয়েও বেশি। আর কোনো কিছুরই বেগ যেহেতু আলোর বেগকে অতিক্রম করতে পারে না, তাই ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের অভ্যন্তরস্থ কোনো ঘটনা আমরা দেখতে পাবো না। এই সীমার বাইরের ঘটনা কিন্তু দেখবো।
কিন্তু মুক্তিবেগতো নির্ভর করে বস্তুর অভিকর্ষের উপর। আবার অভিকর্ষ কাজ করে ভরযুক্ত বস্তুর উপর। আলোরতো ভর নেই। তাহলে আলো কিভাবে ব্ল্যাক হোলের কবলে আটকা পড়ে? এটা জানতে হলে অভিকর্ষ ও আপেক্ষিকত তত্ত্বের একটু ইতিহাস জেনে আসতে হবে।
১৭৮৩ সালে বিজ্ঞানী জন মিচেল ‘ডার্ক স্টার’ (dark stars) শিরোনামে একটি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তিনি ভাবলেন যে কোন বস্তুর ভর এত বেশি ঘনীভূতওতো হতে পারে যে আলোও এর ফাঁদে আটকা পড়ে যাবে। তাঁর সেই ডার্ক স্টারকেই এখন আমরা ব্ল্যাকহোল বলে ডাকি।
একই রকম ভাবনা আসে ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানী মারকুইস ডে লাপ্লাসের মাথায়ও। তবে মজার বিষয় হলো, তিনি তাঁর বই The System of the World এর ১ম এবং ২য় সংস্করণেই শুধু ভাবনাটি ছাপেন এবং তুলে দেন পরবর্তী সংস্করণগুলো থেকে। কারণ, তখনকার সমাজে এই ধরণের ভাবনাকে মানুষ পাগলের প্রলাপ মনে করত। আর বিজ্ঞানী হকিং এর ভাষায়, তিনি নিশ্চয় চাননি পাগলের খ্যাতি পেতে।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রকাশের পর কার্ল সোয়ার্জসাইল্ড এই ধরনের বস্তুর জন্যে একটি গাণিতিক সমাধান বের করেন। এর বেশ কিছু দিন পরে, ১৯৩০ এর দশকের দিকে ওপেনহাইমার, ভলকফ ও সিনডার মহাবিশ্বে এই ধরণের বস্তু থাকার সম্ভাবনা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে থাকেন।
এই  তিন গবেষক প্রমাণ করে দেখালেন, একটি যথেষ্ট ভরযুক্ত নক্ষত্র যখন সব জ্বালানী হারিয়ে ফেলে তখন এতে নিউক্লিয় বিক্রিয়ার বহির্মুখি চাপ থাকে না বলে এটি এর নিজস্ব অভিকর্ষের চাপে চুপসে যেতে থাকে।
এভাবেই আস্তে আস্তে বিকশিত হতে থাকে ব্ল্যাকহোলের ধারণা।
তবে, মিচেল এবং ল্যাপ্লাস- দু’জনেই আলোকে কণা বলে ধারণা করতেন যা অভিকর্ষ দ্বারা আকৃষ্ট হতে পারে। কিন্তু ১৮৮৭ সালে দুই আমেরিকান বিজ্ঞানী মিচেলসন এবং মোরলের বিখ্যাত একটি পরীক্ষা থেকে জানা গেল, আলো সব সময় একটি নির্দিষ্ট বেগে চলে, এর উৎস কোথায় সেটা মোটেই বিবেচ্য নয়। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় অভিকর্ষ কিভাবে আলোকে প্রভাবিত করে? অভিকর্ষ বল বস্তুর ভরের সাথে সম্পৃক্ত। চার প্রকার মৌলিক বলের মধ্যে একটু ভিন্ন ‘বল’ অভিকর্ষ আকর্ষণ করে শুধু ভরযুক্ত বস্তুকে।
কিন্তু আলোরতো কোনো ভরই নেই। তাহলে তার কী দোষ? বেচারা ব্ল্যাক হোলে পড়ে যাবে কেন?  
এই প্রশ্নের সমাধান নিয়ে এসেছিলেন আইনস্টাইন সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের (General theory of relativity) মাধ্যমে। এটা জেনেই আজকে বিদায় নিচ্ছি।
১৬৬৫ সালে সালে বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন দিয়েছিলেন মহাকর্ষ-অভিকর্ষের ধারণা। বলা হয়েছিল, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তু একে অপরকে নিজ দিকে আকর্ষণ করে। বস্তুর ভর যত বেশি হবে, তার অভিকর্ষ ততোই শক্তিশালী হবে। নিউটনের এই সূত্র দিয়ে সূর্যের চারদিকে গ্রহদের গতিপথ ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলেও কয়েকটি বিষয়ের নিখুঁত ব্যখ্যা পাওয়া সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম উদাহরণ ছিল সূর্যের নিকটতম গ্রহ বুধের কক্ষপথের স্থানচ্যুতি।
এরকম আরো কিছু বিষয়ের নিখুঁত ব্যাখ্যা দিতে ব্যার্থ হয় নিউটোনিয়ান মহাকর্ষ। এবার মহাকর্ষের হাল ধরেন বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। ১৯০৫ সালে তিনি প্রদান করেন আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব (Special Theory of Relativity)। এর ১০ বছর পর ১৯১৫ সালে প্রকাশ করেন সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব।
১ম তত্ত্ব মতে, আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে চলমান বস্তুর কাল দীর্ঘায়ন ও দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন ঘটে। বেড়ে যায় ভরও।  আর ২য় তত্ত্বে তিনি মহাকর্ষকে তুলে ধরলেন ভিন্ন আঙ্গিকে। মহাকর্ষ কোন ‘বল’ নয়। এটি হচ্ছে স্থান-কালের (Space-Time) বক্রতা। স্থান এবং কাল আলাদা আলাদা কিছু নয়। স্থানের তিনটি স্থানাঙ্কের সাথে চতুর্থ স্থানাঙ্ক  ‘সময়’ মিলিত হয়ে কোনো একটি ঘটনাকে পূর্ণাংগভাবে ব্যাখ্যা করে।
আপেক্ষিকতার এই নীতি অনুযায়ী প্রত্যেকটি ভরযুক্ত বস্তুই তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়।
মহাকর্ষ (যেমন পৃথিবীর অভিকর্ষ) এভাবে স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দেয়

নিউটোনিয়ান মহাকর্ষের মতই অবশ্য ক্ষুদ্র ভরবিশিষ্ট বস্তুর ক্ষেত্রে এই বক্রতা হবে সামান্যই। অবশ্য এই নীতি আবার আমরা যখন পরমাণুর গহীণে অতি-পারমাণবিক কণিকার জগতে নিয়ে যাবো, তখন এটি একেবারেই খাটবে না। সেখানে আবার রাজত্ব করে বেড়ায় কোয়ান্টাম তত্ত্ব। মহাবিশ্বের ম্যাক্রো (বৃহৎ) ও মাইক্রো (ক্ষুদ্র)- এই দুই জগতের শাসনভার যথাক্রমে তাই এই দুইটি আলাদা তত্ত্বের হাতে।
যাই হোক, বিশাল ভরের বস্তু কতৃক স্থান-কাল লক্ষ্যণীয়ভাবে বেঁকে যায় বলেই নক্ষত্রদের চারদিকে গ্রহদের আর গ্রহদের চারপাশে উপগ্রহের কক্ষপথ তৈরি হয়।
কিন্তু কোনো বস্তু স্থান এবং কালকে বাঁকিয়ে দেয়- এটা বললেই কি মানতে হবে? এর সপক্ষে প্রমাণওতো থাকতে হবে। বলাই বাহুল্য, প্রাচীন কালে প্রদত্ত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক (বা অবৈজ্ঞানিক) তত্ত্বের তুলনায় আপেক্ষিকতাকে অনেক বেশিই পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।
সাধারণ আপেক্ষিকতার ভাষ্য মতে, ভর যেহেতু স্থান কালকে বাঁকিয়ে দেয়, সেহেতু বড় বড় ভরের বস্তুদের লেন্সের মতো আচরণ করা উচিৎ।
অর্থ্যাৎ ধরুণ, আমরা কোনো নক্ষত্রের পেছনে অবস্থিত অন্য কোন বস্তু দেখতে চাই। কিন্তু সাধারণ অবস্থায় সেই বস্তুকে দেখা না গেলেও মাঝখানের বস্তুটি যেহেতু স্থানকে বাঁকিয়ে দেবে, তাই অপরপাশের বস্তু থেকে আসা আলো সেই বক্রপথ অনুসরণ করে দর্শকের চোখে ধরা পড়বে। প্রমাণিত হবার পর এখন এই ঘটনাকে বলা হয় গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং।
গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং এর বদৌলতে আড়ালে লুকিয়ে থাকা বস্তু পর্যবেক্ষণ করা যায়

১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণের সময় সার্বিক আপেক্ষিকতা প্রমাণিত হয়ে গেল। সূর্যের আলোর কারণে সাধারণ অবস্থায় দৃশ্যমান না হলেও সূর্যগ্রহণের সময়ের অন্ধকারে সূর্যের পেছনে অবস্থিত দেখা গেল হায়াডিজ তারাস্তবককে (Hyades Star Cluster)। প্রমাণিত হল আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব। এই পরীক্ষণটি পরিচালনা করেছিলেন স্যার আর্থার এডিংটন।
উল্লেখ্য, সূর্যগ্রহণের সময়ের এই ঘটনা ও বুধের কক্ষপথের নিখুঁৎ বর্ণনাসহ আরো কিছু বিষয়ে সাধারণ আপেক্ষিকতার পূর্বানুমানের সাথে বাস্তব ঘটনা মিলে গেল অবিকলভাবে যেখানে তা নিউটোনিয়ান তত্ত্বের সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ন ছিল না।
অতএব, বলা যাচ্ছে, অভিকর্ষ তার চারপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে দিয়ে ঐ স্থানগামী যেকোনো কিছুকে সেই বক্রপথ অনুসরণ করতে বাধ্য করবে। বস্তুর ভর যত বেশি হবে বক্রতার পরিমাণও হবে ততো বেশি।
এবার চিন্তা করা যাক ব্ল্যাকহোলদের মতো দানবদের কথা। এদের ভর এতই বেশি যে এরা এদের আশপাশের স্থানকালকে নির্দয়ভাবে এমনভাবে বাঁকাবে যে বক্রতা হবে শুধুই অন্তর্মুখী। অর্থ্যাৎ, এই বক্রতায় প্রবেশের দরজা থাকবে কিন্তু বেরুবার দরজা থাকবে না। গ্রামে বর্ষা মৌসুমে পুকুরে মাছ ঢোকানোর জন্যে দুটি বেড়া এমনভাবে মুখোমুখি লাগানো থাকে যে পুকুরে প্রবেশের সময় মাছ ঐ বেড়ার ফাঁক গলে চলে যেতে পারবে কিন্তু পুকুর থেকে বেরোতে পারবে না। ব্ল্যাকহোলের কাজও অনেকটাই এরকম।
ব্ল্যাক হোলে স্থান কালের বিকৃতি
এ কারণেই আলোর কোনো ভর না থাকলেও এটি ব্ল্যাকহোলের ফাঁদে পড়ে যায়। দূর থেকে আসা আলো ব্ল্যাকহোলের ঘটনা দিগন্তের ভেতরে চলে গেলে আর বের হবার রাস্তা পাবে না। ফলে ঘটনা দিগন্তের ভেতরের কোন কিছু আমরা দেখতে পাবো না।
এ তো গেল ব্ল্যাকহোলের ভেতরের অবস্থা। ঘটনা দিগন্তের একটু বাইরে এমন একটি অঞল থাকা সম্ভব যেখানে বক্রতা ভেতরের দিকে অসীম না হয়ে একটি বৃত্তপথ তৈরি করবে। এই বৃত্তের বাইরের অঞ্চলগামী আলো অল্পের জন্যে রক্ষা পেয়ে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু এই বৃত্তাঞ্চলের আলোর কী হবে? এই আলোককণিকাটি ব্ল্যাকহোলের চারদিকে ঘুরে মরবে। অবিরত ব্ল্যাকহোলকে প্রদক্ষিণ করবে।
 
এই আলোকে কি তবে আমরা ব্ল্যাকহোলের উপগ্রহ বলতে পারি? নাহ! উপগ্রহ তো থাকে গ্রহদের। কী বলা যায় ভাবতে থাকুন। ততক্ষণে আমি আজকের মত বিদায়!!!
অন্যান্য পর্বঃ ২, ৩, ৪, ৫, ... 
Category: articles

Saturday, February 13, 2016

অধিকাংশ অন্যান্য গ্যালাক্সির মতই এনজিসি ৪৮৮৯ গ্যালাক্সির কেন্দ্রে বাস করছে একটি বিশাল ভরযুক্ত ব্ল্যাক হোল। জ্যোতির্বিদদের ধারনা, এটি নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে এখন বিশ্রাম নিচ্ছে।
শত শত গ্যালাক্সির ভীড়ে এনজিসি ৪৮৮৯ গ্যালাক্সির ছবি। এরই কেন্দ্রে লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি ব্ল্যাক হোল। 
উপরের ছবির সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং বড় গ্যালাক্সিটিই এনজিসি ৪৮৮৯। ৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে কোমা গ্যলাক্সি ক্লাস্টারে এর অবস্থান। এর কেন্দ্রে থাকা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলটি আগের অনেক রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। এর ভর সূর্যের ২১ বিলিয়ন (বা ২ হাজার ১০০ কোটি) গুণ।
অন্য দিকে এর ঘটনা দিগন্তের ব্যাস ১৩ হাজার কোটি কিলোমিটার। এই পাল্লাটি সূর্য থেকে নেপচুনের কক্ষপথের দূরত্বের ১৫ গুণ।  ঘটনা দিগন্ত হচ্ছে একটি ব্ল্যাক হোলের বাইরে সেই অঞ্চল যেখান থেকে আলোও বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে এর ভেতরের কিছু দেখা সম্ভব হয় না। অন্য দিকে, আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে থাকা সম্ভাব্য ব্ল্যাক হোলখানির ভর সূর্যের ৪০ লাখ গুণ। এর ঘটনা দিগন্তের পাল্লা বুধের কক্ষপথের এক পঞ্চমাংশ মাত্র।
কিন্তু আলোচ্য গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোলের রাক্ষুসে আচরণের সমাপ্তি ঘটেছে। এনজিসি ৪৮৮৯ এর খাবার কক্ষে এটি এখন বিশ্রামরত। বর্তমানে এর আশেপাশে নতুন জন্মানো তারকারা শান্তিতে বেড়ে উঠছে এবং একে প্রদক্ষিণও করছে। 
অন্য ব্ল্যাক হোলের মতই এটি বিভিন্ন গ্যালাকটিক বস্তু যেমন গ্যাস, ধূলিকণা ও অন্যান্য ধ্বংশাবশেষ সাবাড় করে করে একটি আক্রেশন ডিস্ক (Accretion disk) গঠন করে। গ্যাস-ধূলিকণার ঘুর্ণায়মান এই চাকতিকে ব্ল্যাক হোলটি তীব্র অভিকর্ষীয় ত্বরণে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। পরিণামে চাকতির তাপমাত্রা উঠে যায় লক্ষ ডিগ্রি পর্যন্ত। এই উত্তপ্ত বস্তু কতৃক নির্গত হয় দানবীয় এবং শক্তিশালী জেট বা ফোয়ারা । 
সক্রিয় থাকায় সময় জ্যোতির্বিদরা ব্ল্যাক হোলটিকে কোয়াসার শ্রেণিতে নাম তালিকাবদ্ধ করেন। ব্ল্যাক হোলটির ডিস্ক মিল্কিওয়ের চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তি নির্গত করত। ডিস্কটি ব্ল্যাক হোলের খাবারের যোগান দিয়ে দিতে দিতে এক পর্যায়ে আশেপাশের সব গ্যালাকটিক বস্তু নিঃশেষ করে ফেলে। ফলে, এটি এখন সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে। তবু, রহস্যময় কোয়াসাররা মহাবিশ্বের শৈশবকালে কিভাবে গঠিত হয়েছিল তা জানতে ব্ল্যাক হোলটি জ্যোতির্বিদদের গবেষণার কাজে আসবে। 
আলো বেরিয়ে আসতে পারে না বলে ব্ল্যাক হোলকে সরাসরি দেখা না গেলেও পরোক্ষ উপায়ে এর ভর বের করা যায়। এনজিসি ৪৮৮৯ গ্যালাক্সির চারদিকে প্রদক্ষিণরত নক্ষত্রদের বেগ পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছে। এই বেগ থেকেই জানা গেছে ব্ল্যাক হোলটির বিশাল ভরের তথ্য।  


Category: articles

Thursday, February 4, 2016

এক্স-রে (নীল) ও রেডিও (লাল) ডেটার সমন্বয়ে প্রস্তুত ছবি। ছবিটি বড় করে দেখতে এখানে ক্লিক করুন। 
ছবিতে দূর মহাকাশের একটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অবস্থিত ব্ল্যাক হোলের ৩ লাখ আলোকবর্ষ ব্যাপী ছড়িয়ে পড়া নিক্ষিপ্ত কণার একটি বিশাল ফোয়ারা (jet) দেখা যাচ্ছে। 
পিকটর এ (Pictor A) নামক গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা ব্ল্যাক হোলের প্রভাবে সৃষ্ট এই ফোয়ারার ছবিটি নাসা গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে প্রকাশ করেছে। গ্যালাক্সিটি পৃথিবী থেকে ৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। ব্ল্যাক হোলে পতনশীল বস্তুর প্রভাবে বাইরের দিকে কণিকার বিশাল প্রবাহ বা ফোয়ারা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে যা প্রায় আলোর বেগে ছড়িয়ে পড়ছে আন্তঃছায়াপথীয় (Intergalactic) স্থানে। ছবিটি পেতে নাসার চন্দ্রা এক্স-রে অবজারভেটরি ১৫ বছর ধরে কাজ করে গিয়েছে। চন্দ্রার এক্স-রে ডেটার (নীল) সাথে অস্ট্রেলিয়া টেলিস্কোপ কমপ্যাক্ট অ্যারে এর রেডিও ডেটা (লাল) সমন্বয় করে প্রস্তুত করা হয় ছবিখানা। 
পিকটর এ গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে এই ফোয়ারা অবিরত ছড়িয়ে পড়ছে ৩ লাখ আলোকবর্ষ পর্যন্ত। উল্লেখ্য, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিরই ব্যাস মাত্র ১ লাখ আলোকবর্ষ। 
গবেষকরা বলছেন, ছবির ডান দিকে যেমন একটি ফোয়ারা দেখা যাচ্ছে, তেমনি এর বিপরীত দিকে আরেকটি ফোয়ারা কাজ করছে, যাকে বলা হচ্ছে প্রতি-ফোয়ারা (counterjet)। এর আগেও প্রতি ফোয়ারার অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা করা হয়েছিল। তবে, এবারে এর নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল। পৃথিবী থেকে উল্টো দিকে অবস্থিত হওয়াতে সম্ভবত প্রতি-ফোয়ারাকে অনুজ্জ্বল দেখাচ্ছে। 
ছবিতে আরো দেখা যাচ্ছে রেডিও লোব, যেখানে ফোয়ায়ার ধাক্কায় পাশ্ববর্তী গ্যাসে শক ওয়েভজনিত হটস্পট তৈরি হচ্ছে। ফোয়ারার মাথায় অবস্থিত এই হটস্পট অনেকটা সুপারসনিক বিমানের সনিক বুমের মত। 
চন্দ্রার ছবিতে দেখা ফোয়ারা ও প্রতি-ফোয়ারা সম্ভবত চৌম্বকক্ষেত্র রেখার চারপাশে ঘূর্ণনরত ইলেকট্রনের প্রভাবে তৈরি হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটির নাম সিনক্রোট্রন এমিসন (synchrotron emission)। এই ক্ষেত্রে বাইরের দিক নির্গত ইলেকট্রনকে অবশ্যই প্রতি মুহূর্তে বেগ বৃদ্ধি করতে হয়। এটা কিভাবে ঘটে তা এখনো বিজ্ঞানীদের ভালো জানা নেই। এই ফলাফলগুলোর বিবরণ দিয়ে একটি পেপার রয়েল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মাসিক প্রকাশনায় স্থান পাচ্ছে।
সূত্রঃ
১। Earth Sky
Category: articles

Saturday, November 14, 2015

প্রশ্নঃ ব্ল্যাক হোলতো দেখা যায় না, তাহলে এদেরকে শনাক্ত করা হয় কিভাবে?
উত্তরঃ ব্ল্যাক হোল আলোকে আটকিয়ে রাখার মাধ্যমে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও নিজের কর্মকাণ্ড গোপন রাখতে পারে না। এটি এর নিকটস্থ বস্তু, বিশেষ করে গ্যাসকে এর অভিকর্ষ বল দ্বারা নিজের দিকে টেনে নেয়। ফলে, গ্যাস সর্পিল পথে এতে গিয়ে পতিত হয়। এই পতনশীল গ্যাস ব্ল্যাকহোলের চারপাশে একটি চাকতি (disk) গঠন করে। এই গ্যাস এত দ্রুত পাক খায় যে এরা উত্তপ্ত হয়ে এক্স-রে নির্গত করে। এই এক্স-রে বা রঞ্জন রশ্মি পৃথিবীতে বসে শনাক্ত করা যায়।
ব্ল্যাক হোলের কবলে নিকটস্থ গ্যাস। নীল অংশের কেন্দ্রে অবস্থিত কালো বিন্দুই ব্ল্যাক হোল। 

এছাড়াও ব্ল্যাকহোলের নিকটস্থ অন্য তারকার গতির প্রকৃতি থেকেও ব্ল্যাকহোল শনাক্ত করা যায়। যেমন কোন বাইনারি বা অন্য কোন মালটিপল স্টার সিস্টেমে গতি থেকে বোঝা যায়, এখানে আরেকটি তারকা থাকা উচিৎ। কিন্তু বাস্তবে ওখানে কাউকে দেখা যায় না, যার অর্থ সেটি ব্ল্যাকহোল।

সূত্রঃ
১। ক্যালটেক
Category: articles