Advertisement

Sunday, June 19, 2016

প্রশ্নোত্তরঃ মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে থেকে স্থির দেখায় কি?

প্রশ্নঃ পৃথিবী যদি সেকেণ্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে নিজ অক্ষের উপর ঘুরতে থাকে তাহলে মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে স্থির দেখায় কেন?
অত জোরে নিজ অক্ষের উপর ঘুরলে তো মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় বাংলাদেশে অবতরণ করতে গেলে তো আমেরিকায় চলে যাওয়ার কথা! আর মহাকাশ থেকে তো পৃথিবীকে পাগলের মত ঘুরতে দেখা যায় না, তাহলে এর ব্যাখ্যা কি?
[রাকিব হাসান]

উত্তরঃ
প্রথমত, পৃথিবী নিজ অক্ষের উপর সেকেন্ডে ৩০ কিমি. বেগে ঘুরছে না। বিষুব অঞ্চলে পৃথিবীর আবর্তন বেগ হল ঘণ্টায় ১৬৭০ কিলোমিটার বা সেকেন্ডে প্রায় ৪৬৪ মিটার। আপনি যেটি উল্লেখ করেছেন সেটি হল সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণ বেগ। কিন্তু তাতে আপনার প্রশ্ন বাতিল হচ্ছে না।
আরও পড়ুনঃ 
 ☛ পৃথিবীর আবর্তন বেগ কত?
 ☛ আবর্তন ও প্রদক্ষিণের পার্থক্য কী?

পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে নিজ অক্ষের সাপেক্ষে ঘুরছে। দুই মেরুর ঠিক মাঝখানে বিষুব অঞ্চল অবস্থিত।
তাছাড়া আবর্তন বেগ পৃথিবীর সব জায়গায় সমান নয়। বিষুব রেখা থেকে উত্তরে বা দক্ষিণে আবর্তন বেগ কমে যায়। আমাদের বাংলাদেশে পৃথিবীর আবর্তন হচ্ছে সেকেন্ডে ৪২৪ মিটার করে।
কিন্তু তবু প্রতি সেকেন্ডে ৪৬৪ বা ৪২৪ মিটার বেগও খুব একটা ছোট নয়। এই গতিতে যেতে থাকলে কোনো বাস তিনি সেকেন্ড পার হবার আগেই এক কিমি. পথ পার হয়ে যাবে। তাহলে পৃথিবীর এই ঘূর্ণন মহাকাশ থেকে দেখা যাচ্ছে না কেন?

একটা গল্প শুনি। একবার রাশিয়ায় একজন লোক দাবি করলেন তিনি খুব সহজে ভ্রমণ করার একটি কৌশল বের করেছেন। দরকার হবে শুধু একটি বেলুন। ধরুন কেউ বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ যেতে চাইছেন। তাহলে বাংলাদেশ থেকে একটি বেলুনে চেপে উপরে উঠে যেতে হবে। ইতোমধ্যে পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে বেলুনের নিচে ইউরোপ এসে যাবে। এখন নেমে পড়লেই হল। খুব সহজ ভ্রমণ। বিমান আবিষ্কারের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই এভাবে মিটে যেত।
এই কৌশল বাস্তবে কাজ করে না। এর কারণ হল, আমরা যখন বেলুনে চেপে উপরে উঠব, তখনো আমরা পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মধ্যেই থাকব। ঘুরতে থাকব পৃথিবীর সাথেই। এটা যদি না হত তাহলে আমাদের কষ্ট করে বেলুনে চড়ার দরকার ছিল না। মাটি থেকে এক লাফ দিয়ে উপরে উঠে ৩ সেকেন্ড পরে নামলেই দেখা যেত এক কিলোমিটারের বেশি পশ্চিমে চলে গেছি। বাস্তবে আমরা যখন আকাশ পথে ভ্রমণ করি, তখনো পৃথিবীর সাথে সাথে ঘুরতেই থাকি।
বিমান নিজেও পৃথিবীর সাথে সাথে ঘুরতে থাকে 
এ জন্যেই বিমান থেকে তাকালেও আমরা পৃথিবীকে স্থিরই দেখব।
মূল কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ এতটা শক্তিশালী যে আমরা এর থেকে অনেক উপরে উঠলেও এর অভিকর্ষীয় টানের সীমানার মধ্যেই থেকে যাই। আর এই টানের কারণেই কিন্তু পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডল আছে। আমাদের মাথার উপরে যে বায়ুমণ্ডল সেটিও পৃথিবীর সাথে সাথে ঘুরছে। আরেকটি মজার ব্যাপার হল, একটু আগে বলেছি কেউ লাফ দিলে তিন সেকেন্ডে এক কিলোমিটারেরর বেশি পথ যেতে পারবেন। আসলে যাবেন ঠিকই। কিন্তু পৃথিবী যদি তাকে নিজের অভিকর্ষ দ্বারা ধরে না রাখত তবে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরার কারণে কিছুক্ষণ পরই তিনি পৃথিবী থেকে আলাদা হয়ে যেতেন। পৃথিবী ছুটে চলে যেত কক্ষপথ ধরে। এছাড়াও পৃথবীর অভিকর্ষ যদি যথেষ্ট শক্তিশালী না হত, তবে আমরা কেন্দ্রবিমুখী বলের কারণে এর পৃষ্ঠ থেকে আলাদা হয়ে যেতাম।
আরও পড়ুনঃ
পৃথিবীর আবর্তনের কারণে আমরা পড়ে যাই না কেন?

আবার বেলুনের ঘটনায় ফিরে আসি। বেলুনকে কি এমন কোনো উচ্চতায় পাঠানো সম্ভব না, যেখানে এটি পৃথিবীর সাথে ঘুরবে না? নিচে এসে আমরা দেখব পায়ের তলার পৃথিবী ঠিকই ঘুরে গেছে?
হ্যাঁ, সম্ভব। সেক্ষেত্রে বেলুনকে অনেক বেশি বেগ দিয়ে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের বাইরে নিয়ে যেতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে এটা বেলুন দিয়ে সম্ভব না। এই কাজ করা হয় রকেটের মাধ্যমে। এর জন্যে রকেটের প্রাথমিক বেগ হতে সেকন্ডে অন্তত ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার। এই বেগকে বলা হয় মুক্তি বেগ।
আরও পড়ুনঃ 
মুক্তি বেগের পরিচয়

এখন কথা হল, পৃথিবীর উপরের সব জায়গা থেকেই কি পৃথিবীকে স্থির দেখায়? অবশ্যই না। শুধু পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের অভ্যন্তর থেকেই এমনটা দেখাবে। আমরা টেল্কিস্কোপ দিয়ে সূর্যসহ অন্যান্য গ্রহদের আবর্তন দেখি, কারণ আমরা এদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের এতটা ভেতরে নই যে এরা আমাদেরকেসহ ঘুরবে। একইভাবে আমরা যদি যথেষ্ট দূরে গিয়ে পৃথিবীর দিকে তাকাই তাহলে একেও ঘুরতে দেখব। আবর্তন ও প্রদক্ষিণ দুটোই দেখা যাবে।
দেখুন নিচের ভিডিও অনেক দূর থেকে সৌরজগৎসহ বিভিন্ন নক্ষত্রদের ঘূর্ণন দেখা যাচ্ছে। কারণ এই ছবি তোলা হয়েছে এদের অনেক দূর থেকে, এদের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতর থেকে নয়।

এখন বাকি প্রশ্ন হল, মহকাশযান ফিরে আসার সময় এক জায়গায় অবতরণ করতে গিয়ে আরেক জায়গায় চলে যায় না কেন? এটাও এতক্ষণে মোটামুটি স্পষ্ট হবার কথা। মহাকাশযান ফিরে আসার বিভিন্ন কৌশলে প্রথমে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ভেতরে প্রবেশ করে। পরে স্বাভাবিকভাবে অবতরণ করে।
মহাকাশযানের ভেতরে আগে থেকেই প্রোগ্রাম করা থাকে এটি কখন, কীভাবে কোথায় অবতরণ করবে। ফলে পৃথিবীর আবর্তনের কারণেতো দূরের কথা, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরলেও কোনো সমস্যা হয় না। 


Advertisement 02

Abdullah Al Mahmud

লেখকের পরিচয়

আব্দুল্যাহ আদিল মাহমুদ। প্রভাষক, পরিসংখ্যান বিভাগ, পাবনা ক্যাডেট কলেজ। এর আগে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন EAL-এ। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে। সম্পাদনা করছেন Stat Mania বিশ্ব ডট কম। পাশাপাশি লিখছেন বিজ্ঞানচিন্তা, ব্যাপন পাই জিরো টু ইনফিনিটিসহ বিভিন্ন ম্যাগাজিনে। অসীম সমীকরণ মহাবিশ্বের সীমানা নামে দুটি বই লেখার পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন অ্যা ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম । লেখকের এই সাইটের সব লেখা এখানে ফেসবুক | পারসোনাল ওয়েবসাইট

2 comments

Write comments