Advertisement

Thursday, February 16, 2017

স্মরণে মেঘনাদ সাহা

আজ ১৬ ফেব্রুয়ারি।

১৯৫৬ সালের এই দিনে মৃত্যুবরণ করেন বিখ্যাত ভারতীয় ও বাঙালি জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। তাপীয় আয়নীকরণ তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি বিজ্ঞানজগতে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এছাড়াও তাকে সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ –এর জনক বলা হয়। তাঁর আবিষ্কৃত এই সমীকরণ নক্ষত্রের ভৌত ও রাসায়নিক ধর্মাবলি ব্যাখ্যায় ব্যাবহৃত হয়।

জ্যোতির্পদার্থবিদ মেঘনাদ সাহা 

মেঘনাদ সাহার জন্ম ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকার কাছে শ্যাওড়াতলী গ্রামে। তখন ঢাকা শহর ব্রিটিশদের শাসনাধীন ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল। গরীব ঘরে জন্ম তার। বাবা জগন্নাথ সাহা ছিলেন মুদি দোকানদার। ছেলেবেলায় এক আত্মীয়ের বাড়িতে ঝুটা কাজের বিনিময়ে থেকে সাভারের অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। অর্থাভাবে বহু প্রতিকূলতার মাঝে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে স্কুল শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরে ঢাকা কলেজে অধ্যয়ন করেন।  কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময় তিনি সত্যেন্দ্রনাথ বোস ও জে এন মুখার্জির সহপাঠী ছিলেন।  আর আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ছিলেন তাঁর শিক্ষক।

তিনি পদার্থের তাপীয় আয়নীকরণ বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। এই গবেষণার ফলস্বরূপ তিনি একটি সমীকরণ প্রদান করেন। এটিই সাহা সমীকরণ নামে পরিচিত। তারকাসমূহের বর্ণালি সম্পর্কিত গবেষণার মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কোনো তারার অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরিমাপ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীতে সাহা সমীকরণ প্রয়োগ করে কোনো তারকা বা নক্ষত্র গঠনকারী বিভিন্ন উপাদানসমূহের আয়নিত অবস্থা সম্পর্কে তারা অবগত হন।  সৌররশ্মির ওজন ও চাপ নির্ণয়ে সাহা একটি যন্ত্রও তৈরি করেছিলেন। এছাড়াও হ্যালির ধূমকেতু নিয়ে গবেষণাকারী বিজ্ঞানীদের মাঝে তিনি ছিলেন অন্যতম।

এক পরমানুক গ্যাসীয় পদার্থের জন্য সাহা সমীকরণ

শিক্ষাঙ্গনেও ছিল তার সরব উপস্থিতি। ১৯২৩ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত সাহা এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞান অনুষদের ডীন হিসেবে মনোনীত হন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯২৭ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হন। সাহা ১৯৩৪ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের ২১ তম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেছিলেন।

ভারতবর্ষে বিজ্ঞানশিক্ষা ও বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণার প্রসারে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ভারতের বিভিন্ন স্থানে তিনি বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ গড়ে তোলেন। এছাড়াও ১৯৪৯ সালে কলকাতায় ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স প্রতিষ্ঠাতেও তার অসামান্য অবদান ছিল। পরবর্তীতে তার সম্মানার্থে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ করা হয় “সাহা ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স”।

সাহা Science and Culture নামে  একটি পত্রিকাও চালু করেন ও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়াও তার নেতৃত্বে বেশ কিছু বিজ্ঞান বিষয়ক সংগঠন গড়ে ওঠে।  এগুলোর মাঝে ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্স (১৯৩০), দ্যা ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটি (১৯৩৪) ও ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা কালটিভেশন অব সায়েন্স (১৯৪৪ ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ভারতের নদী পরিকল্পনার প্রধান স্থপতি ও দামোদর উপত্যকা প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন।

এত সাফল্যের পরেও মেঘনাদ সাহার জীবনে কিছুটা অতৃপ্তি ছিল। তিনি যে কখনও নোবেল পুরষ্কার লাভ করতে পারেননি! তবে তিনি বেশ কয়েকবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি ডি এম বোস এবং শিশির কুমার মিত্র কর্তৃক পদার্থবিদ্যায় ১৯৩০ সালের নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। নোবেল কমিটি সাহার কর্মকাণ্ডকে সাধুবাদ জানায়।  তারা তাঁর গবেষণালব্ধ ফলাফলকে “গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ” হিসেবে আখ্যায়িত করলেও এটাকে “আবিষ্কার” হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। ফলে সেবার তিনি নোবেল পুরষ্কার অর্জনে ব্যার্থ হন। এরপর ১৯৩৭ এবং ১৯৪০ সালে কম্পটন ও ১৯৩৯, ১৯৫১ ও ১৯৫৩ সালে শিশির কুমার মিত্র পুনরায় নোবেলের জন্য মেঘনাদ সাহাকে মনোনীত করেন। তবে নোবেল কমিটি তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় প্রতিবারই তাকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল।

বিজ্ঞানজগতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি অধরা থাকলেও সমস্ত বাঙ্গালির গর্ব মেঘনাদ সাহা তৎকালীন খ্যাতনামা সকল বিজ্ঞানীর প্রশংসা পেয়েছিলেন। তাঁর সম্পর্কে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিদ আলবার্ট আইনস্টাইন বলেন,
Dr. M.N. Saha has won an honored name in the whole scientific world     

সূত্রঃ
১। উইকিপিডিয়াঃ Meghnad Saha
২। উইকিপিডিয়াঃ মেঘনাদ সাহা 


Advertisement 02

Unknown

লেখকের পরিচয়

নাসরুল্লাহ মাসুদ। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও প্রকৌশল বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী।
লেখকের সব লেখা এখানে। ফেসবুকে লেখকঃ Nasrullah Masud